নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বাংলার বারো ভুঁইঞাদের ইতিহাস আর একগুচ্ছ জনশ্রুতির দেখা মিলবে বৈদ্যবাটির সাবেক ধনাঢ্য চৌধুরীদের ঠাকুরদালানে। আর দেখা মিলবে এক অদ্ভুত দেবীপুজোর কাঠামোর। বাংলার চর্চিত যে রূপে দুর্গাপুজো হয় চৌধুরীদের ঠাকুরদালানোর প্রতিমা তার ব্যতিক্রম। বেনজির সেই একচালায় সরস্বতীর স্থানে পুজো পান গোবিন্দ জিউ, রাধামাধব কৃষ্ণ। জনশ্রুতি ওই রাধামাধব পুজো পেতেন বাংলার বিখ্যাত বারোভুঁইঞার অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের বাড়িতে। তাঁকেই একচালায় ধরে রেখেছে চৌধুরী পরিবার। ওপার বাংলা থেকে দেবীর একচালা ঠাঁই নাড়া হয়ে বৈদ্যবাটিতে এসেছে। কিন্তু বদলায়নি কাঠামো আর কঠিন নিগড়ে বাঁধা পুজোর রীতি।
বর্তমানে বৈদ্যবাটির গোবিন্দনগরে দুর্গাপুজোর মরশুমে পুজো হয় ওই বিরল একচালার প্রতিমার। কার্তিকমূর্তির উপরে চালা আলো করে থাকেন বংশীবাদনরত কৃষ্ণ। নথি নেই, ইতিহাসের পাতাও বিবর্ণ। কিন্তু প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে ওই বিরল দশভুজা নীরবে, নিভৃতে পুজিতা হচ্ছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে চালায় স্থান হয়নি সরস্বতীর। তাঁর স্থানেই চালায় থাকেন কৃষ্ণ-কানাইয়া। কেন এমন ধারা প্রতিমা? তার একটা উত্তর জনশ্রুতিতে আছে। কিন্তু সরস্বতীই কেন বাদ গেলেন, সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট যুক্তি মেলে না। বৈদ্যবাটির চৌধুরীদের ঘনিষ্ঠ শ্রীরামপুরের প্রাবন্ধিক সুমন্ত বড়াল বলেন, লক্ষ্মী-নারায়ণ একসঙ্গে থাকবে, সেটাই হয়তো চেয়েছিলেন চৌধুরীদের পূর্বপুরুষরা। হয়তো বা সামজিক সংস্কারে কার্তিক ও গণেশের মতো পুরুষ দেবতাকে চালা থেকে সরাতে মন চায়নি। তবে পরিবারের পূর্বপুরুষ বেদজ্ঞ শিবরাম পুজোর জন্য নিজস্ব নিয়ম করে ছিলেন। সেই শিবরামপুরাণ মতেই বৈদ্যবাটির চৌধুরীদের পুজো হয়।
বর্তমান বাংলাদেশের যশোরে দাপুটে সাম্রাজ্য ছিল বারো ভুঁইঞা প্রতাপাদিত্য ও তাঁর কাকা বসন্ত রায়ের। তদানীন্তন ফরিদপুরের ক্ষমতাশালী পণ্ডিত ছিলেন শিবরাম সার্বভৌম। জনশ্রুতি মোতাবেক, ১০২০বঙ্গাব্দে বসন্ত রায়, মতান্তরে প্রতাপাদিত্য তাঁদের কুলদেবতা গোবিন্দজিউকে সার্বভৌম পরিবারে পাঠানোর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পুজো মরশুম তখন সার্বভৌম বাড়িতে দশভুজার প্রতিমা গড়া চলছে। আচমকা হাজির হন বসন্ত রায়। স্বপ্নাদেশের কথা শুনিয়ে চালায় স্থান দিতে বলেন গোবিন্দজিউকে। বেদজ্ঞ শিবরাম অনেক ভাবনাচিন্তা করে দেবীর একচালার চেহারা ও গোবিন্দজিউয়ের সহাবস্থানের সূত্র বের করলেন। তিনি গোবিন্দজিউকে নারায়ণরূপে লক্ষ্মীর সঙ্গে স্থান দিলেন। বাদ পড়লেন সরস্বতী।
সার্বভৌমরা ১৯৪৭ সালে ভারতে আসেন। বৈদ্যবাটির গোবিন্দনগরে বসতি গড়েন। সেই ইস্তক হুগলির গঙ্গাপাড়ে এক বেনজির মূর্তি আর বিরল নিয়মের পুজো চলে আসছে।



