নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: তাঁর কাছে দুর্গাপ্রতিমা গড়াটাই পুজোর সামিল। বামুনের ছেলে তাই পুজো করতে না গিয়ে প্রতিমা গড়ার পাঠ নিয়েছিলেন। তারপরে শুরুও করেছিলেন প্রতিমা গড়া। কিন্তু বিধি বাম। তাঁর এক হাত আজ অসাড়। কিন্তু বিধির বিধান তিনি মানেননি। তাই একহাতেই দশভুজা গড়ার দক্ষযজ্ঞে সাফল্যের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হুগলির পোলবার আমনান পঞ্চায়েতের বীরেন্দ্রনগরের মিশ্রপাড়ার মৃৎশিল্পী ধনঞ্জয় মিশ্র। তাঁর শিল্পকলা দেখলে ‘একহাতে’র শিল্পীর নির্মাণ বলে বোঝাই যায় না। গত দশবছর ধরে একহাতেই নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন মধ্য চল্লিশের ধনঞ্জয়। ঘরে অভাব মাঝেমাঝেই জীবনের সুর কাটে, কিন্তু ফের মাটির কাছেই ফিরে যান ধনঞ্জয়।
২০১৫ সালে পথ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন আমনানের মৃৎশিল্পী তথা আঁকার শিক্ষক ধনঞ্জয়। মাথাতেও জোরাল চোট লেগেছিল। তারপর থেকেই একটা হাত অবশ, অসাড়। অনেকটা কাজ করলে অন্যহাতেও চাপ পড়ে। কাঁধের কাছে ব্যথা চাগিয়ে ওঠে। কিন্তু মাটি হাতি নিলেই ব্যথা ভুলে যান শিল্পী। প্রতিমা নিয়ে তারিফ জুটলেও একহাতের শিল্পীকে কাজ দিতে চায় না অনেক পুজো কমিটিই। তবুও প্রতিমার বরাত জোটে। ধনঞ্জয় বলেন, মা দশভুজাই জুটিয়ে দেন। হাতের জোর না থাকলে কি হবে, মনের জোরে মাটি ছেনে দেবতা গড়ি। ওটাই আবেগ, ওটাই অবসর। রোজগারেরও পথ। আচমকা উদাস চোখে আকাশপানে তাকান ধনঞ্জয়। পাশে বসে চোখের জল মোছেন সুদীপ্তা মিশ্র। ধনঞ্জয়ের ঘরের দশভুজা। বলেন, জানি না বিধাতার কি ইচ্ছে। নইলে যিনি দেবতা গড়েন তাঁরই হাত অসাড় হয়? দিনে ঠাকুর গড়েন আর রাতে ব্যথায় ছটফট করেন।
ছেলেবেলাতেই প্রতিমা গড়ায় হাত পাকিয়েছিলেন ধনঞ্জয়। ব্রাহ্মণবাড়ির ছেলে যজমানি করেননি। পাশে ছিলেন পুরোহিত বাবা। ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন আকাদেমি অব ফাইন আর্টসে। প্রথাগত শিক্ষা আর আবেগের যুগলবন্দীতে আঁকার হাত অনবদ্য ধনঞ্জয়ের। প্রতিমা গড়ায় যখন সবে নামযশ জুটছিল তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাত। দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় বামহাতের শক্তি। আজ জীবনে অভাব আছে, কিন্তু মাটির অবয়বকে ধরে আঁধার ঘনাতে দেননি ধনঞ্জয়। ঘরের দশভুজাকে সঙ্গে নিয়ে এক বাহুতেই প্রতিদিন সহস্রবাহু হয়ে ওঠার এক ভিন্ন লড়াইয়ের শঙ্খনাদ করছেন।



