Bartaman Logo
৫ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে শুরু মল্লারপুরের রায়বাড়ির দুর্গাপুজো, পাঁচশো বছর আগের নবাবি ঐতিহ্য

শরতের সোনাঝরা সকালে ঢাকের কাঠি পড়ার আগেই মল্লারপুরের দক্ষিণগ্রামের বাতাস অন্যরকম এক আমেজে মেতে ওঠে

কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে শুরু মল্লারপুরের রায়বাড়ির দুর্গাপুজো, পাঁচশো বছর আগের নবাবি ঐতিহ্য
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, রামপুরহাট: শরতের সোনাঝরা সকালে ঢাকের কাঠি পড়ার আগেই মল্লারপুরের দক্ষিণগ্রামের বাতাস অন্যরকম এক আমেজে মেতে ওঠে। গ্রামবাসী ভালো করেই জানেন, রায়বাড়ির প্রদীপের শিখা জ্বলে ওঠা মানেই ‘উমা’ এসে গিয়েছে।

Advertisement

পাঁচশো বছর আগের কথা। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর রাজত্বকাল। মল্লারপুরের তরুণ জমিদার আশারাম রায় তখন কেবল সাবালক হয়েছেন। পিতৃহারা আশারাম লক্ষ্য করলেন, আশপাশের গ্রামে কোথাও মা দুর্গার কোনো পুজো নেই। পুজো মানেই তো আনন্দের জোয়ার, গ্রামের দূর-দূরান্তের সাধারণ মানুষগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটানোর খুব ইচ্ছে হল তাঁর। কাকা গোলাপ আচার্যের পৃথক পুজো আগে থেকেই ছিল, এবার আশারাম নিজের কাঁচা মাটির মন্দিরে একচালার প্রতিমা গড়ে সংকল্প করলেন দুর্গাপুজোর। নবাব তাঁর প্রজা দরদ ও জমিদারি পরিচালনায় মুগ্ধ হয়ে উপাধি দিলেন-‘বাবু’। সেই থেকে এই ভিটে বাবুপাড়ার রায়বাড়ি নামে পরিচিত।
অতীতে বোধনের দিন থেকে পুজো শুরু হয়। আজও কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি পড়তেই বোধনের দিন রায়বাড়ির নাটমন্দিরে জ্বলে ওঠে সংকল্প প্রদীপ। প্রদীপের সোনালি শিখাটি যেন পাঁচশো বছরের ইতিহাসকে নতুন করে প্রাণ দেয়। পরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি ৯০ বছরের মিহিরকুমার রায়ের নামে সংকল্প করে রবিবার পুজো শুরু হল। 
পরিবারের সদস্য স্বদেশরঞ্জন রায় বলেন, আমাদের এই প্রদীপ দশমীতে দেবীর বিসর্জনের পরেই আস্তে আস্তে নিভে যাবে। এর মাঝে প্রদীপের তেল ফুরোতে দেওয়া যাবে না।
এই রায়বাড়ির দুর্গাপুজোর কিছু নিয়ম বড় অদ্ভুত। রাজকীয় ভোজের আয়োজন যতই হোক না কেন, দেবীর অন্নভোগে আর কিছু থাকুক না থাকুক -‘কচু শাক’ থাকতেই হবে। মা দুর্গা এখানে কচু শাক না পেলে নাকি তৃপ্ত হন না। এছাড়া বোধন থেকে শুরু করে সপ্তমীতে বিশেষ বলিদানের পর নবমীতে পাঁঠা, মেষ ও মোষ বলির প্রাচীন প্রথা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলা হয়। দশমীতে কুমারী পুজো ও সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন এলাকাবাসী। আর সপ্তমী থেকে নবমী? গোটা দক্ষিণগ্রাম পাত পেড়ে বসে প্রসাদ খান রায়বাড়ির উঠোনে।
তবে সময় বদলেছে। এককালে এই পুজো ঘিরে জমিদারদের আনাগোনা হত। রাতে বসত বাইজি নাচের আসর, ঢোল-সানাইয়ের সুরের মূর্চ্ছনায় রায়বাড়ি উৎসবমুখর হয়ে উঠত। দশমীতে দেবী প্রতিমাকে কাঁধে চাপিয়ে বিশাল শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হত দিঘিতে।
এখন আর সেই জমিদারি আভিজাত্য নেই, নাচের আসরও বসে না। কাঁধের বদলে দেবী প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় ট্রাক্টরে। কিন্তু দেবীর প্রতি ভক্তি আজও এতটুকু ফিকে হয়নি। চাকরির সুবাদে বেঙ্গালুরু, মুম্বই বা কলকাতায় ছড়িয়ে থাকা রায়বাড়ির নবীন প্রজন্ম পুজোর ক’দিন ঠিক ফিরে আসেন এই ভিটেতেই। রাতের আলো ঝলমলে মণ্ডপ ঘুরে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, তখনও গ্রামের ছোট-বড় সবাই কিন্তু একবারের জন্য হলেও বাবুপাড়ার রায়বাড়ির দালানে এসে দাঁড়ান। কারণ দক্ষিণগ্রামের বাসিন্দারা বলেন, প্যাণ্ডেল যত বড়ই হোক না কেন, রায়বাড়ির জোড়াপুজো না দেখলে আমাদের দুর্গাপুজোটা যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। বিসর্জনের রাতে যখন ট্রাক্টরের শব্দ মিলিয়ে যায় আর সংকল্প প্রদীপটি ধীরে ধীরে নিভে আসে, অপরাজিতা স্তোত্রপাঠের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। ধূপের গন্ধ আর প্রদীপের স্মৃতির উষ্ণতা রেখে যায় পরের বছরের নতুন আশার আলো। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ