সৌরভ ভট্টাচার্য, তেহট্ট: এক সময়ে দুর্গাপুজোর চারদিন নিরানন্দে ডুবে থাকত সীমান্তের এই গ্রাম। পুজোর আনন্দে শামিল হওয়ার সামর্থ্য ছিল না অধিকাংশ পরিবারের। গ্রামের মা-বোনেরা অঞ্জলি দিতে যেতেন পাশের গ্রামে। ছোটোদের মনেও ছিল আক্ষেপ। সেই ছবি বদলাতে এগিয়ে এসেছিল কিছুটা সচ্ছল বিশ্বাস পরিবার। গ্রামবাসীদের অনুরোধে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। দেখতে দেখতে ৪৮ বছর পেরিয়ে আজ সেই পুজো আর কোনো পরিবারের একার নয়, হয়ে উঠেছে গোটা গ্রামের উৎসব। তেহট্ট থানার সীমান্তবর্তী নবীন নগর গ্রামের এই পুজো এখন সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।
বিশ্বাস পরিবারের বর্তমান কর্তা সুবোধ বিশ্বাস জানান, প্রায় ৪৮ বছর আগে নবীন নগরে দুর্গাপুজো হতো না। সীমান্তবর্তী এই গ্রামে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই ছিল দিনমজুর। ফলে দুর্গাপুজো করার সামর্থ্য ছিল না তাঁদের। গ্রামের মহিলাদের অঞ্জলি দিতে যেতে হতো পাশের গ্রামে। ছোটোরাও পুজোর আনন্দ থেকে দূরে থাকত। উৎসবের দিনগুলিতে গ্রাম থাকত নিরানন্দ। তাঁর কথায়, ‘গ্রামের বয়স্ক মানুষরা একদিন ঠিক করেন, গ্রামে দুর্গাপুজো করতে হবে। তাঁরা আমাদের পরিবারের কাছে এসে অনুরোধ করেন। মহিলারা যাতে নিজের গ্রামে অঞ্জলি দিতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই ছোটো করে পুজো শুরু হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। গ্রামের মানুষের সেই আবেগকে উপেক্ষা করতে পারিনি আমরা।
প্রথম দিকে পুজোর আয়োজন ছিল বিশ্বাস পরিবারের উদ্যোগে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মনে হয়, এই পুজো শুধু একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। গ্রামের মানুষকে পুজোর সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন সুবোধবাবুর বাবা। তিনি গ্রামবাসীদের জানিয়ে দেন, পুজো সকলের। যে যেমন পারবেন, তেমন ভাবেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। সেই শুরু। কারও সামর্থ্য সামান্য, কারও বা একটু বেশি। কিন্তু সবার অংশগ্রহণেই ধীরে ধীরে বদলে যায় পুজোর চরিত্র। বাড়ির উঠোনে শুরু হওয়া পুজো পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে। এখন পুজোর চার দিন গ্রামের মানুষ একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন। অঞ্জলি থেকে খাওয়াদাওয়া, সবেতেই সকলে অংশগ্রহণ করেন। গ্রামের বাসিন্দা খোকন বিশ্বাস বলেন, আগে অঞ্জলি দিতে আমাদের অন্য গ্রামে যেতে হতো। এখন নিজের গ্রামেই পুজোর আনন্দে শামিল হতে পারি। চারদিন গ্রামের সবাই একসঙ্গে আনন্দ করি, খাওয়াদাওয়া করি। এই পুজো এখন আর কোনও একটি পরিবারের নয়, আমাদের সকলের।’ ৪৮ বছর আগে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল গ্রামের মানুষের অঞ্জলি দেওয়ার ইচ্ছেকে সম্মান জানাতে, আজ তা নবীন নগরের সামাজিক বন্ধনের অন্যতম অবলম্বন। -নিজস্ব চিত্র



