নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: মণ্ডপ থেকে গঙ্গা প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। বিসর্জনের দিন ভক্তদের কাঁধে চেপে সপরিবারে সে পথে গঙ্গায় যান দুর্গা। তাঁর নিত্যপুজোয় কোনও বিঘ্ন ঘটলে রণচণ্ডী রূপে শাস্তি দেন পুরোহিত ও ভোগের রাঁধুনিদের। আবার অপার করুণাময়ী রূপে সন্তানদের ডাকে বিপদভঞ্জনকারী হিসেবে হাজিরও হন। খড়দহের সূর্যসেন নগরের দুর্গাকে ঘিরে এমন নানা মিথের ছড়াছড়ি। পুজোর সময় একই মন্দিরের পৃথক মণ্ডপে আলাদাভাবে পুজো পান দুই দুর্গা। স্থায়ী মণ্ডপে তিনবেলা নিত্যসেবা হয়। পুজোয় প্রতিদিন ভক্তদের ঢল নামে।
১৯৪৯ সালে খড়দহের সূর্যসেন নগরে সর্বজনীন দুর্গোৎসবের সূচনা হয়েছিল। চালা তৈরি করে সে বছরই তৈরি অস্থায়ী মণ্ডপ। সেবার মণ্ডপ ও পুজোর সূচনায় এসেছিলেন স্বামী দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংস। উদ্বোধনের পর হেসে বলেছিলেন, ‘মা এখানে পাকাপাকি থাকবেন।’ তাঁর কথা মিলে যায় ২০২১ সালে। সর্বজনীন দুর্গাপুজোর পাশাপাশি স্থায়ী মণ্ডপে নিত্যসেবার সিদ্ধান্ত নেন পুজো কমিটির সদস্যরা। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের পরামর্শে বেনারস থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হয় আচার্য সঞ্জয় শাস্ত্রীকে। তিনি দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ভোর পাঁচটায় মঙ্গলারতি ও বাল্যভোগ নিবেদন। সকাল ১০টায় নিত্যপুজো। দুপুর সাড়ে ১২টায় পঞ্চব্যঞ্জনে ভোগ নিবেদন। দুপুর একটা থেকে মন্দির বন্ধ। বিকেল সাড়ে চারটের সময় ফের খোলে মন্দির। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা মঙ্গলারতি। রাতে শীতলভোগ খেয়ে ন’টার পর সপরিবারে শয়নে যান দুর্গা।
স্থায়ী মণ্ডপের একদিকে নিত্যপুজোর জন্য মায়ের মন্দির। তার পাশে বাৎসরিক পুজোর স্থান। কার্তিকের পাশে থাকেন লক্ষ্মী। গণেশের পাশে থাকেন সরস্বতী। ৭৬ বছরে পা দিয়েছে পুজো। তাকে ঘিরে হাজার মিথের ছড়াছড়ি। এবছর চালচিত্র সমেত প্রায় ১৮ ফুটের প্রতিমা বানাচ্ছেন পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত শিল্পী সনাতন রুদ্র পাল। মণ্ডপ সাজবে নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল, যামিনী রায়ের পটচিত্র ও টেরাকোটায়। অষ্টমীতে ভোগে থাকে বৈচিত্র। অন্নভোগে পাঁচরকম ভাজা, পনির, ধোকা, ছানা ও সব্জির তরকারি, চাটনি, পায়েস। পুরোহিত আচার্য সঞ্জয় শাস্ত্রী বলেন, ‘মায়ের লীলার কোনও শেষ নেই। পাদপদ্মে রাখা জবা, বেলপাতা ও রক্তচন্দন সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে মন্দির খুলে সরাতে বাধ্য করেছিলেন মা। রান্নায় কোনও ত্রুটি হলে হাতেনাতে শাস্তি দেন। আবার তাঁর করুণায় বহু মানুষ উপকৃত হন।’ পুজো কমিটির সম্পাদক সঞ্জীব গুহঠাকুরতা বলেন, ‘কত বার কত বিপত্তি এসেছে। কিন্তু মা কাঁধে চেপেই গঙ্গায় গিয়েছেন।’ স্থায়ী মণ্ডপে নিত্যপুজো দর্শন, ভোগ পাওয়া, মন্দিরে ভোগ দেওয়া ও বসে প্রসাদ খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এই বিগ্রহের নিত্যসেবা হয়ে থাকে। - নিজস্ব চিত্র