সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: ‘ছাপ’! দু’অক্ষরের এই ছোট শব্দটি আসলে আমাদের সভ্যতার অভিজ্ঞান। আদিকাল থেকেমানুষের সভ্যতার যাত্রাপথ ধরা রয়েছে এই ছাপের মধ্যে,গুহাচিত্র থেকে আজকের বায়োমেট্রিক ইম্প্রেশনে। অতীত থেকে বর্তমানের সেই যাত্রাই ফুটে উঠেছে এবছর দমদম পার্ক তরুণ দলের প্যান্ডেলজুড়ে। শিল্পী পূর্ণেন্দু দে ও তাঁর সহযোগীরা মণ্ডপকে গড়ে তুলছেন ছাপের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান রূপে।
এমআরআই, সিটি স্ক্যান, আঙুলের ছাপ, ব্যাঙ্কের লোগো— মণ্ডপে ঢোকার দু’ধারের দেওয়ালজুড়ে রাখা ব্লকগুলিতে রয়েছে এমনই সব ছাপ। সঙ্গে লেখা বিভিন্ন বার্তা—‘শাসক বদলে গেলে বদলায় মুদ্রার ছাপ’, ‘পায়ের ছাপে ধরা লক্ষ্মী’, ‘সন্দেশের ছাপে মিষ্টি’র মতো নানান তথ্য। সেই পথ ধরে একটু এগলেইবড় একটা ঘর। সেখানে রয়েছে ছাপের ইতিহাস ও বিবর্তনের কাহিনি। পাথরের গায়ে ফসিল ও গুহাচিত্র থেকে বইয়ের প্রচ্ছদ, অন্নপ্রাশন-বিয়ের কার্ড, মুদ্রা, মিষ্টির ছাঁচ, বিয়ের পর নববধূর পায়ের ছাপ থেকে ডাকটিকিট বা ভোটের সিলমোহর— বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে রয়েছে ছাপের নানা কাহিনি। ইট, কাঠ, বালি দিয়ে তৈরি হয়েছে ছাপের কারুকাজ। শিল্পীর কথায়, স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘জন্মেছিস যখনএকটা দাগ রেখে যা’। তাঁর সেই উক্তি থেকেই আমাদের এই ভাবনার জন্ম। সকাল থেকে রাত, আমাদের জীবনজুড়ে চলে ছাপ দেওয়ার পালা। অফিসে হাজিরা দেওয়া বা রেশন নেওয়া, বায়োমেট্রিক মেশিনে আঙুল ছোঁয়াতেই হয়। আর প্রতি মুহূর্তে মোবাইলের লক খুলতেও দিতে হয় আঙুলের ছাপ। ভোটের মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়। তারও একটা ছাপ রয়েছে। ঘরের মাঝে রয়েছে সুবিশাল এক পায়ের ছাপ। আর জাগতিক এই সমস্ত ছাপ দেখার পর দর্শকরা পৌঁছবেন মায়ের কাছে। সেই ঘরজুড়ে আধ্যাত্মিকতার ছাপ। রয়েছে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তাও। চমক রয়েছে মাতৃমূর্তিতেও। লালরঙা গালার ছাপে সুবিশাল এক ‘সিলমোহর’-এর ভিতের বিরাজ করছেন দেবী। অন্যতম উদ্যোক্তা প্রতিক্ষণ ঘোষের কথায়,মানুষ বেঁচে থাকে তার ছাপের মধ্যে দিয়ে। আর মা দুর্গাই তো সর্বশ্রেষ্ঠ ছাপ।
মানুষের জীবনের একমাত্র সত্য ব্রহ্ম। সেই ভাবনাকেই দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তুলেছে লেকটাউনের নতুন পল্লি প্রদীপ সংঘ। এবছর তাদের থিম ‘অমরত্ব’। শিল্পী কথায়, জ্ঞান ও চেতনা যখন একসঙ্গে মিলিত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় অমরত্বের। আর ভারতের ক্ষেত্রে জ্ঞানের কথা বলতে হলে প্রথমেই মনে আসে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। অতীতের সেই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যরীতির অনুকরণে তৈরি করা হচ্ছে প্যান্ডেল। ভিতরে থাকবে নালন্দা থেকে পাওয়া কিছু ভাস্কর্যের প্রতিরূপ। পোড়ামাটির ইট, কাঠ, প্লাই, কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি। দেওয়ালজুড়ে বেশ কিছু ছবি। অতীতের শিক্ষার ছবি ধরা থাকবে প্রাচীন পুঁথিতে। মণ্ডপের পাশাপাশি প্রতিমার অভিনব রূপ দর্শকদের নজর কাড়বে বলে আশাবাদী পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা বাবু দাস। বৌদ্ধিক ধাঁচের অনুকরণে তৈরি হয়েছে প্রতিমা। দেবী দুর্গা এখানে চক্রসম্বর (বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধ্যানদেবতা) ও বজ্রবারাহীর (বজ্রযোগিনীর ভয়ঙ্কররূপ) যুগলরূপ। তিনিই জ্ঞান ও শক্তির সম্মিলিত প্রতীক। দেবীর মূর্তিতে রয়েছেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরও। একই শরীরে চারজন। আসলে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর মিলেই ব্রহ্মাণ্ড। মা দুর্গা হলেন শক্তি চেতনা। তাদের মিলনেই তৈরি হয় ‘অমরত্ব’।