Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ, ইতিহাস তৈরির প্রহর গুনছে দমদম বিধানসভা

মতিঝিলের পাশে চায়ের দোকানে সন্ধ্যাবেলার আড্ডা জমেছে। ভোট এখন। ফলে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়া কোনো কথাই হচ্ছে না। কে জিতবে, কে হারবে এসব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত।

তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ, ইতিহাস তৈরির প্রহর গুনছে দমদম বিধানসভা
  • ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ মাইতি, দমদম: মতিঝিলের পাশে চায়ের দোকানে সন্ধ্যাবেলার আড্ডা জমেছে। ভোট এখন। ফলে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়া কোনো কথাই হচ্ছে না। কে জিতবে, কে হারবে এসব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত। এই আবহে দমদমের ছবিটা কেমন? হাওয়া বইছে কোন দিকে? অফিস ফেরত চায়ের দোকানে আসা যুবক প্রিয়াংশু দত্ত মুখের কথা কেড়ে বললেন, ‘হাওয়া একদিকেই। রাস্তায় বাইক নিয়ে ঘুরলেই বুঝতে পারবেন। ঘাসফুল ফুল ছাড়া বাজারে তো কাউকেই দেখছি না।’ চায়ের কাপ হাতে সুবোধ বিশ্বাস। বয়সের কারণে গলা ভেঙেছে। বললেন, ‘আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। দমদমে আগের মতো অশান্তি নেই।’ মাঝবয়সি অরূপ মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা একেবারে নেই তা কিন্তু নয়। তবে তা থেকে ফায়দা তোলার চেষ্টা বিরোধীদের কোথায়? প্রচারে তো তার ছাপ দেখছি না।’ আর একজন ফুট কাটলেন, ‘কতগুলো বুথে এজেন্ট দিতে পারবে সেটাই তো প্রশ্ন।’ 

Advertisement

দমদমের চায়ের ঠেক থেকে ভাতের হোটেল, বাজার থেকে মুদির দোকান, সর্বত্র দমদমের ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। তবে কে জিতবে তা নিয়ে মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মানুষ একপ্রকার নিশ্চিত। তাই তাঁরা রাজ্যের অন্যান্য বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে ভাবছেন। 
রাজনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতিহাস তৈরির মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূল প্রার্থী ব্রাত্য বসু। এবার তিনি জিতলে হবেন দমদমের সবথেকে বেশিবারের বিধায়ক। সেই জন্যই তৃণমূল আয়োজন, প্রচার চেষ্টার কসুর করছে না। এককালের লালদুর্গ দমদম ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট থেকে ঘাসফুলের গড়ে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে পরিবর্তনের ঝড়ে সিপিএম প্রার্থী গৌতম দেবকে সাড়ে ৩১ হাজারের মতো ভোটে পরাজিত করেছিলেন তৃণমূলের ব্রাত্য বসু। তারপর ২০১৬ সালে সিপিএমের পলাশ দাসকে ৯ হাজারের মতো ভোটে হারান। ২০২১ সালে শক্ত পরিস্থিতিতেও বিজেপির বিমলশঙ্কর নন্দকে প্রায় ২৭ হাজার ভোটে পরাজিত করেন। 
১৯৭৭, ১৯৮২ ও ১৯৮৭ সালে পরপর তিনবার জিতেছিলেন সিপিএমের শান্তিরঞ্জন ঘটক। তার আগে ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত একটানা বিধায়ক হিসেবে ছিলেন সিপিআই প্রার্থী তরুণ সেনগুপ্ত। ব্রাত্যবাবু এবার জিতলে দমদমের ভোট রাজনীতির সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাবেন। 
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে প্রায় ১০ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। তবে আত্মতুষ্টিতে মোটেও ভুগছেন না ব্রাত্য। ওয়ার রুমে কর্মী বৈঠক, ওয়ার্ড ধরে ধরে শেষবেলার প্রচার চলছে লাগাতার। এবার হাওয়া কেমন বুঝছেন? ব্রাত্য বলেন, ‘দমদমের প্রতিটি গলি, কলোনি আমার পরিচিত। সপ্তাহে নিয়ম করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে মানুষের সঙ্গে দেখা করি।’ তিনি জানান, দমদমে নতুন রাস্তা, পুকুর ও ড্রেন সংস্কার, নতুন পথবাতি, বাগজোলা খাল সংস্কার, পুরসভা হাসপাতালের মানোন্নয়ন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, সরকারি স্কুল ও কলেজের পরিকাঠামোর উন্নয়ন ইত্যাদি মিলিয়ে বহু কাজ হয়েছে। এই উন্নয়ন চোখে দেখা যায়। তার বাইরেও বড়ো বদল হয়েছে দমদমের। ২০১১ সাল থেকে বোম-গুলির শব্দ শোনা যায় না। তার বদলে সংগীত মেলা, বই মেলা, মার্গ সঙ্গীতের আসর, যাত্রা মেলা, নাট্য উৎসব, পাখি মেলা, খাদ্য মেলার মতো একাধিক অনুষ্ঠান হয়। সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে দমদম। এই পরিবর্তন শহরের প্রত্যেক বাসিন্দা অনুভব করেন। মধ্যরাতে কর্মক্ষেত্র থেকে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারেন মহিলারা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, ‘তিনটি বড়ো কাজ রয়েছে। নাগেরবাজার থেকে প্রাইভেট রোড পর্যন্ত ফ্লাইওভার সম্প্রসারণ, এইচএমভি থেকে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত নতুন ফ্লাইওভার তৈরি, নাগেরবাজারে আধুনিক মানের বাস স্ট্যান্ড তৈরি। সরকারি অনুমোদন হয়ে গিয়েছে। ভোটের পর দ্রুত রূপায়ণ হবে।’ বিরোধীদের বিষয়ে বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করতে চান না ব্রাত্য। বলেন, ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। বিরোধীরা এলাকার খামতির কথা বলছেন। সেটাই কাম্য। তবে মানুষ এবার বাংলার অস্মিতা রক্ষায় একজোট। এসআইআরের নামে বাঙালির উপর ভয়াবহ অত্যাচার, সাঁজোয়া গাড়ি এনে বাঙালির বিরুদ্ধে দিল্লির যুদ্ধ ঘোষণার বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।’ 
অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী অরিজিৎ বক্সি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে আদাজল খেয়ে ময়দান চষছেন। হ্যান্ড মাইক হাতে গলি থেকে তস্য গলিতে ঢুকে পড়ছেন। শহরজুড়ে বেআইনি বহুতল, সিন্ডিকেটরাজ, রাস্তায় জমা জল ও পানীয় জলের সমস্যা, রাস্তা, বাগজোলা খালের নিকাশি, বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সহ একাধিক অভিযোগে বিদ্ধ করছেন তৃণমূলকে। জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অরিজিৎ। বলেন, ‘লাগামছাড়া দুর্নীতি, মহিলা নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু তোষণের বিরুদ্ধে মানুষ রায় দিতে প্রস্তুত।’ আর বামপ্রার্থী ময়ূখ বিশ্বাস যুবদের মুখ। তিনিও দলের মরা গাঙে জোয়ার এনেছেন বলে অনেকের মত। তাঁর পদযাত্রা, পথসভার ভিড় চোখ টানছে মানুষের। ময়ূখ সহজভাবে মানুষের মধ্যে মিশে যাচ্ছেন। গ্যাসের ডেলিভারি কর্মী থেকে শুরু করে নির্মাণশ্রমিক সকলকে জড়িয়ে ধরে মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন করার বার্তা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘দমদমের নাগরিক পরিষেবা ভেঙে পড়েছে। দমদম রোডে যানজট, বাগজোলা খালের সংস্কার না হওয়া, জল জমা, পানীয় জলের সমস্যা, সরকারি স্কুলের ভেঙে পড়া পরিকাঠামো ইত্যাদির মতো হাজারো সমস্যায় জর্জরিত দমদমবাসী। তার উপর শাসক দলের অত্যাচারও রয়েছে।’ জানালেন, প্রচারে বেরিয়ে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ