Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

ডায়েটে ওষুধ ছাড়াই ডায়াবেটিস  কন্ট্রোল সম্ভব? 

ডায়েটে ওষুধ ছাড়াই ডায়াবেটিস  কন্ট্রোল সম্ভব? 
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
শতভিষা বসু: আলোচনার প্রথমেই একটা বিষয় জানিয়ে রাখি। অনেক ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিরই  রক্তে সুগারের মাত্রা অনেকখানি বেড়ে থাকে। এমন ক্ষেত্রে শুধু ডায়েট কন্ট্রোল করে কাজ হবে না। তখন ওষুধ বা ইনসুলিন, ডায়েট এবং এক্সারসাইজের সম্মিলিত প্রয়াসে সুগার কমাতে হবে। এরপর যখন সুগার কন্ট্রোলে চলে আসবে তখন খাদ্যাভ্যাস ও এক্সারসাইজ সঠিক নিয়ম মেনে চললে অনেকক্ষেত্রেই হয়তো ওষুধের প্রয়োজনীয়তাও কমে যাবে। কারও কারও ওষুধ হয়তো আর লাগবেও না। তাহলে প্রশ্ন হল খাদ্যতালিকায় কী কী পরিবর্তন আনা দরকার? এক্ষেত্রে প্রথমেই একটা কথা মাথায় পরিষ্কার করে ঢুকিয়ে নেওয়া উচিত— ডায়াবেটিসের জন্য আলাদা কোনও ডায়েট নেই। একজন ডায়াবেটিসহীন ব্যক্তির সুস্থ সবলভাবে বাঁচার জন্য যা যা খাওয়া দরকার ঠিক সেই সেই খাবারই খাবেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি। অর্থাত্‍ পুষ্টিকর সব খাবারই খেতে পারেন একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি। এখানে সুস্থ থাকতে চাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যাঁরা সুস্থ থাকতে চান তাঁরা বেশ কিছু খাদ্যকে ‘বিষ’ জ্ঞান করেই দূরে সরিয়ে রাখেন। সেসব খাদ্য কী কী? কোন ধরনের খাদ্যই বা খাওয়া দরকার? দেখা যাক।
Advertisement
সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে বাদ দিন
• চিনি, গুড়, মিষ্টি রস, সফট ড্রিংকস। • গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি আছে এমন খাদ্যও খাওয়া যাবে না। সে আবার কেমন ধরনের খাদ্য? তা বোঝার সহজ উপায় হল, যে ধরনের খাদ্য পরিপাকতন্ত্রে তাড়াতাড়ি ভেঙে যায় ও রক্তে দ্রুত সুগারের মাত্রা বাড়ায় তাই হল উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাদ্য। উদাহরণ হিসেবে রসগোল্লা, ময়দার তৈরি খাদ্য, আম, কলার মতো রসাল ফল ইত্যাদির কথা বলা যায়।  
• এই প্রসঙ্গে একটা মিথ ভাঙা দরকরা। তা হল, প্রচলিত ধারণা অনুসারে মাটির তলার ফসল সুগার রোগীরা খেতে পারেন না। ভুল কথা। নিশ্চয় খেতে পারেন, বিশেষ করে গাজর, বীট অবশ্যই খাওয়া যায়। কারণ এই ধরনের ফসলে প্রচুর পরিমাণে খনিজ ও ভিটামিন থাকে। আবার আলু, রাঙাআলু, ওল, কচু ইত্যাদি আনাজের ক্ষেত্রে একটু বিধিনিষেধ মেনে চলা প্রয়োজন। কারণ এই ধরনের ফসলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স-এর মাত্রা বেশি।
• কেক, পেস্ট্রি, ময়দার পাঁউরুটি, হোয়াইট পাস্তা, মাফিন, মিষ্টি, ময়দা দিয়ে তৈরি যে কোনও খাদ্য, সাদা ভাত, প্যান কেক, ওয়েফেলস এবং পিজ্জা খাওয়া বাদ দিয়ে দেওয়াই ভালো।
• ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড পূর্ণরূপে ত্যাগ করা প্রয়োজন। অর্থাত্‍ নুডলস, পাস্তা, মোগলাই, ভাজা খাবার, কাটলেট খাওয়া এড়িয়ে যান।
সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ
• কত সময় অন্তর খাবার খাচ্ছেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ থাকতে প্রত্যেকের উচিত একেবারে অনেকটা না খেয়ে বরং অল্প অল্প করে বার বার খাওয়া। খুব ভালো হয় আড়াই ঘণ্টা ব্যবধানে খাবার খেতে পারলে।
শর্করা চিনুন
শর্করাজাতীয় খাদ্য নিয়ে ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে বিভ্রান্তি কাজ করে। তবে শর্করাজাতীয় খাদ্য পুরোপুরি এড়ানো যায় না। একজন ব্যক্তিকে খেতেই হবে। কারণ এই ধরনের খাদ্য থেকেই শরীর সারাদিনের কাজকর্ম চালানোর শক্তি অর্জন করে। শর্করাজাতীয় খাদ্য খেতে হবে শুধু মাত্র দিনের তিনটি প্রধান মিল অর্থাত্‍ ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনারে। আর হ্যাঁ, এই তিন সময়ে খেতে হবে ‘জটিল শর্করাজাতীয়’ খাদ্য। তা কেমন? 
পাতে রাখুন ভাত, রুটি। ভাতের মধ্যে আতপ বা গোবিন্দভোগ চাল খেলে চলবে না। কারণ তা সরল শর্করা। আবার খাওয়া যাবে না ময়দার রুটি। এই ধরনের সরল শর্করা দ্রুত শরীরে সুগার বের করে। তাই খান সেদ্ধ চালের ভাত। আবার সেদ্ধ চালের সঙ্গে তুলনা করলে ব্রাউন রাইস উত্তম। তবে তা সকলের পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়। তার দরকারও নেই। অন্যদিকে ময়দার তুলনায় গমের রুটি খাওয়া ভালো। আবার জোয়ার, বাজরার রুটি খাওয়াও স্বাস্থ্যকর। খাওয়া যেতে পারে ওটস-এর খিচুড়ি। এই ধরণের খাদ্যে শর্করার সঙ্গে প্রচুর ফাইবার থাকায় খাওয়ার পরেই রক্তে দ্রুত সুগার মেশে না। বরং ধীর ধীরে সুগার মেশে। এছাড়া ফাইবার থাকায় পেট ভরেও থাকে দীর্ঘসময়। উল্টোপালটা খাওয়ার প্রবণতা রোধ হয়।
টিফিন পিরিয়ড
সারাদিনে প্রধান তিনটি মিল বাদেও দিনে অন্তত তিনবার ছোট ছোট টিফিন টাইম থাকছেই। কারণ অল্প মাত্রায় খাবার খেলে দ্রুত খিদে পেতে বাধ্য। সেই সময় খাবেন কী? অবশ্যই শর্করাজাতীয় খাদ্য এড়িয়ে চলতে হবে। বরং হাতের কাছে রাখুন ফাইবার যুক্ত খাদ্য। তা কেমন?—
 ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের মাঝামাঝি সময়ে খান পেয়ারা, কমলালেবু, মুসাম্বির মতো একটা গোটা ফল। গোটা ফলে ফাইবার থাকে।  তবে ফলের রস খাওয়া যাবে না। কারণ ফলের রসে কিছুটা ভিটামিন ও খনিজ থাকলেও সরল শর্করা থাকে প্রচুর পরিমাণে! এর ফলে ফ্রুট জ্যুস দ্রুত রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া একগ্লাস ফলের রস খেতে হলে অন্তত দু’টি ফলের প্রয়োজন হবেই। তাতে ক্যালোরিও বেশি ঢুকবে শরীরে। 
 ছাতু, ছাতুর শরবতও খাওয়া যায় নিশ্চিন্তে। ছাতুতে ফাইবার আর প্রোটিনও থাকে যথেষ্ট মাত্রায়। এছাড়া ছাতু খেলে পেট দীর্ঘসময় ভরে থাকে।
 বিকেলের দিকে খান ভাজা বা সেদ্ধ ছোলা। এছাড়া অঙ্কুরিত ছোলা, মুগডাল, পাঁচ কড়াই খেতে পারেন শসা, টম্যাটো, পিঁয়াজ কুচি আর চাট মশলা মাখিয়ে। তাতে পেটও ভরে, শরীরে পুষ্টিও ঢোকে। তাছাড়া ক্যালোরির মাত্রাও কম হওয়ায় চট করে সুগার বাড়ে না।
 বিকেলের দিকে নিশ্চিন্তে খেতে পারেন ডালের স্যুপ বা সব্জি দিয়ে তৈরি চিকেন স্যুপ।
 দিনের যে কোনও সময় বেশি বেশি খিদে পেলে নিশ্চিন্তে খেতে পারেন শসা। পেট ভার থাকে, খিদেও পায় না, শর্করা জাতীয় খাদ্য খাওয়ার বিপুল চাহিদাও কম হবে।
সব খাবার বন্ধ?
একেবারেই না। সব মাপকাঠি সঠিক থাকলে, সারা মাস সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকলে সপ্তাহে একটা করে মিষ্টি খাওয়া যায়। কিংবা ধরুন ঠিক করলেন একদিন বিরিয়ানি খাবেন। সেক্ষেত্রে গোটা বিরিয়ানি নয়। অর্ধেক বিরিয়ানি খান। খাবারটা খান সকালে বা রাতে। সকালের দিকে খেলে দিনের বাকি সময়টা অন্যান্য খাবারের পরিমাণ কমিয়ে ফেলুন। আর একেবারে রাতে বিরিয়ানি খাবার ইচ্ছে হলে সকাল থেকে অন্যান্য খাদ্যগুলি কম খান।
গ্লাইকোসাইলেটেড হিমোগ্লোবিন বা এইচবিএ১সি পরীক্ষা এবং ডায়েট
এইচবিএ১সি হল গত তিনমাসে রক্তে সুগারের মাত্রা ঠিক কতখানি ওঠানামা করেছে তার হিসেব। ডায়েট সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে এইচবিএ১সি-এর গ্রাফের ওঠানামা কম হয়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এই গ্রাফের ওঠানামা দেখলে বোঝা যায় তিনি খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ অনিয়ম করেছেন কি না! অবশ্য কোনও কোনও ওষুধ সেবনের কারণেও রক্তে সুগারের ওঠানামা হয়, তবে সেগুলি অন্য বিষয়। তাই ডায়েট কন্ট্রোল সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা বোঝার সঠিক উপায় হল এইচবিএ১সি পরীক্ষা।
লেখক : হাওড়ার নারায়ণা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ