Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস? এখনও চোখ পরীক্ষা না করালে বিপদ শিয়রে!

দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস? এখনও চোখ পরীক্ষা না করালে বিপদ শিয়রে!
  • ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
পরামর্শে শঙ্করজ্যোতি হাসপাতালের বিশিষ্ট চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডাঃ শিবাশিস দাস
Advertisement
রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকেই ‘ডায়াবেটিস’ বা চলতি কথায় ‘সুগার’ বলে। যুগ যুগ ধরে এই অসুখ নিয়ে চলে আসছে এক পরিচিত লব্জ— ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নিঃশব্দ ঘাতক। এ বদনাম সে এমনি এমনি পায়নি। প্রকৃতভাবেই এই অসুখ অবহেলিত হলে শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। সবথেকে বেশি যেসব অঙ্গের ক্ষতি হয়, তার মধ্যে অন্যতম হল চোখ। চোখের পরদার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে ডায়াবেটিস। অথচ বেশিরভাগ রোগী ও তাঁদের পরিজন এদিকটাই খেয়াল করেন না। ফলে ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথির প্রভাবে অনেক সময়ই দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। এভাবেই নিঃশব্দে ক্ষতি করে চলে ডায়াবেটিস। 
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি 
চোখের পিছনের ভাগের নার্ভসমষ্টি নিয়ে তৈরি হয়েছে রেটিনা। একটি চোখের আনুবীক্ষণিক ছবিতে দেখা যায়, রেটিনার উপর অসংখ্য রক্তনালী রয়েছে। এদের কাজ রেটিনায় অক্সিজেন এবং পুষ্টি পৌঁছে দেওয়া। রেটিনাতেই বাইরের যাবতীয় আলো বৈদ্যুতিক সংকেতের রূপ পায়। সেসব সংকেত বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্ক নানারকম পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করে। কিন্তু দিনের পর দিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস চোখের এই অংশের ক্ষতি করে। ফলে দৃষ্টিশক্তি কমতে শুরু করে। চোখের ক্ষতি হলে তা চিরস্থায়ী সমস্যা হয়েই থেকে যায়। আর পাল্টানো যায় না। তাই ডায়াবেটিস হলে রেটিনোপ্যাথি নিয়ে প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে হবে। নইলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ভয় থাকে। নিয়ম করে চোখ দেখাতে হবে সুগারের রোগীকে। নয়তো ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, ইনসুলিনের সাহায্যে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করার পরেও রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 
এই অসুখে কেন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়?
চোখের পিছনের অংশের পরদায় রক্তবাহী শিরায় লিকেজ হলে, চোখের পরদার স্তরের মাঝে এক ধরনের ফ্লুইড জমে। ফলে রেটিনার কেন্দ্রে অবস্থিত ম্যাকুলা অংশ পুরু হয়ে যায়। ম্যাকুলা ব্যবহার করেই আমরা সবকিছু স্পষ্ট করে দেখতে পাই। এই অংশে পুরু হয়ে গেলে দৃষ্টিশক্তিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। রোগীও চোখে কম দেখেন। 
মাত্র একবছর সুগার! তাতেও চিন্তা করব?
না, মাত্র একবছর আগে ডায়াবেটিস বা সুগার ধরা পড়লে রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ভয় সাধারণত থাকে না। তবে সুগার ধরা পড়ার পর থেকেই এই বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। প্রাথমিক পর্যায়েই পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া ভালো চোখ কেমন আছে। আগে থেকেই চোখে পাওয়ার বা অন্য কোনও সমস্যা থাকলে সুগার ধরা পড়ার পরপরই সতর্ক হতে হবে। তাই প্রতি ৩-৪ মাস অন্তর রেটিনোপ্যাথির টেস্ট করা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস থাকলে তো আরও বেশি সচেতন হতে হবে। ডায়াবেটিসে চোখের পরদার পুরনো রক্তবাহী শিরাগুলি ফেটে গিয়ে নতুন নতুন শিরা তৈরি হয়। নতুন করে তৈরি হওয়া রক্তবাহী শিরাগুলি সহজে ফেটে যায়। ফলে চোখের অভ্যন্তরে অবস্থিত পরদায় রক্তপাত হতে থাকে। রোগী বুঝতেই পারেন না যে তাঁর চোখের ভিতরে রক্তপাত হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই রক্তপাতের পরিমাণ বাড়তে থাকে। দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হতে শুরু করে। যখন এই সমস্যা রোগী বুঝতে পারেন ততদিনে অসুখ অনেক গভীরে চলে গিয়েছে। 
এই অসুখের কয়েকটি পর্যায় থাকে। একেবারে প্রাথমিক স্তরে রেটিনোপ্যাথি রেটিনার রক্তনালীগুলিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। এই সময় দৃষ্টিশক্তির উপর তেমন কোনও প্রভাব পড়ে না। তবে চোখের আভ্যন্তরীণ ক্ষতি হওয়া শুরু হয়ে যায়। রেটিনার পরীক্ষা না হলে আলাদা করে অসুখ ধরাও পড়ে না। পরের ধাপে প্রলিফারেটিভ রেটিনোপ্যাথি হয়। তখন রেটিনার একটা বড় অংশ উপযুক্ত পরিমাণে রক্ত সরবরাহ করতে পারে না। এই ধাপে রেটিনোপ্যাথিকে গুরুত্ব না দিলে দৃষ্টিশক্তির বড় ক্ষতি হতে পারে। এরপর ম্যাকুলোপ্যাথি হয়। অর্থাৎ ম্যাকুলার চারপাশে এই অসুখ প্রভাব বিস্তার করে। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণতর হয়ে ভিট্রিয়াস হেমারেজ হয় ও রেটিনার পরদা ছিঁড়ে দৃষ্টিশক্তি চলে গিয়ে ট্র্যাকশনাল রেটিনাল ডিটাচমেন্ট হয়। 
বিপদসীমায় কারা?
• পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁরা এই বিষয়ে সচেতন না হলে সমস্যা বড় আকার নেবে। তাই ইদানীং সুগার ধরা পড়ার পর থেকেই বছরে অন্তত একবার করে রেটিনার পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। না হলে যতদিনে রোগী বুঝতে পারেন তাঁর রেটিনোপ্যাথি হচ্ছে, ততদিনে রোগ হাতের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। 
• সুগারের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও সতর্ক হতে হবে। যাঁদের ক্রনিক কিডনির সমস্যা রয়েছে, সতর্ক হন তাঁরাও।
• ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী অন্তঃসত্ত্বা হলে রেটিনোপ্যাথি নিয়ে বিশেষ সচেতন হতে হবে। 
রোগ প্রতিরোধে কী করবেন?
এই রোগের একমাত্র প্রতিকার দ্রুত রোগ নির্ণয় করে তার চিকিৎসা শুরু করা। নির্দিষ্ট ওষুধ ঠিক মতো সেবন করে, ডায়াবেটিসের জন্য উপযুক্ত ডায়েট মেনে ও এক্সারসাইজ করে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এইচবিএওয়ানসি-র মাত্রা ৭-এর নীচে থাকলে রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি অনেকটা কম থাকে। যথাসময়ে চেকআপই রোগ ঠেকানোর একমাত্র দাওয়াই
চারপাশে বহু ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষই ‘রেটিনোপ্যাথি’ সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন। পাওয়ার, ছানি বা অন্যান্য সমস্যা এলে তবেই চোখ দেখাতে যান, কিন্তু রেটিনার চেকআপ করেন না। তাই এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। 
এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। মদ্যপান ও ধূমপান এড়িয়ে চললে ভালো। চোখে আগে থেকে কোনও সমস্যা না থাকলে ও দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস থাকলে অন্তত ৬ মাস অন্তর রেটিনোপ্যাথি পরীক্ষা করান। আর চোখে সমস্যা থাকলে ৩-৪ মাস অন্তর এই পরীক্ষা করুন। এতেই রোগ থেকে দূরে থাকবেন।
চিকিৎসা
রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসায় মূলত ইন্ট্রাভিট্রিয়াল ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে লেজার চিকিৎসা বা লেজার ফোটোকোয়াগুলেশনের দ্বারা রক্তবাহী শিরার রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়। রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসার ধরন ঠিক করা হয়। রোগ মারাত্মক আকার না নিলে লেজার ও ই঩নজেকশনের মাধ্যমেও চিকিৎসা সম্ভব। তবে চোখের অভ্যন্তরে খুব বেশি মাত্রায় রক্তক্ষরণ হলে এবং রোগ বাড়াবাড়ি আকার নিলে দৃষ্টিশক্তি বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ