• মাদকাসক্ত মানেই মন্দ মানুষ। সন্তর্পণে হোক, সক্রিয় বিদ্বেষেই হোক, সমাজ এহেন অপ্রকৃতিস্থদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দূরে সরিয়ে দেয়। এড়িয়ে চলে। সংস্রব ত্যাগ করতে চায়। দাগিয়ে দেওয়া বিশেষণে। মদ্যপ কি়ংবা নেশাসক্তদের এক নিষিদ্ধ নগরীর নাগরিক বানিয়ে দেয় এক বাক্যে। অথচ কেউ একবারের জন্য তলিয়ে দেখে না, সাময়িক তাল-লয়হীন মানুষগুলির মাদকাসক্তির পেছনে কোনও কারণ আছে কি না। কেন সেই মানুষটি স্বাভাবিক দৈনন্দিনতাকে ফুৎকারে অস্বীকার করে এক বোধহীন বোহেমিয়ানতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সচেতন স্বঘোষিত সুশীল সমাজের এই উন্নাসিক উদাসীনতার অহংকারকে সেদিন যেন ঠাট্টা করে গেলেন মকরন্দ দেশপাণ্ডে। তাঁরই তৈরি দল ‘অংশ থিয়েটার’-এর সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা ‘পিয়াক্কড়’-এর মঞ্চায়নে। একক অভিনয়ে। ‘আমি আর্ট ফেস্টিভ্যাল’-এ, কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটিতে হল এই নাটকের মঞ্চায়ন।
মাথায় ঝাঁকড়া চুল। অবিন্যস্ত দাড়ি, গোঁফে ঢাকা মুখের ছিপছিপে মানুষটিকে প্রায়ই দেখা যায় হিন্দি সিনেমায়, বিচিত্র ও ব্যাতিক্রমী চরিত্রে। আদপে মারাঠি মঞ্চ জগতের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব মকরন্দ দেশপাণ্ডে সেদিন দেড় ঘন্টার প্রযোজনায় দেখিয়ে গেলেন মুদ্রার উল্টোপিঠ। উপহাস আর অবজ্ঞার আড়ালে নেশাসক্ত মানুষগুলির একাকিত্বের অবয়ব। কখনও মদ্যপের ভূমিকায়, কখনও দৈনন্দিন জীবনের যাঁতাকলে তিলে তিলে পেষাই হতে থাকা, সামানতম্য সুখ ও শান্তি হাতড়ে বেড়ানো মানুষের মনোলগে, কখনও উচ্চবিত্তের উচ্চারণে বলে গেলেন মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে যাবার প্রকৃত প্রেক্ষাপট। গল্পহীন বিন্যাসে। শুধুমাত্র এক একটি পরিস্থিতির প্রয়োগ ঘটিয়ে। সেই পরিস্থিতির বিনিসুতো দিয়েই নাটকের অবয়ব নির্মাণ করে চলেন মকরন্দ অপূর্ব মুন্সীয়ানায়।
সমাজের উচ্চবিত্তদের নেশাসক্ত হয়ে পড়ার এক রূপ। পরিস্থিতির ঘুর্ণাবর্তে নিচু তলার মানুষগুলোর অসহায় আত্মসমর্পণের ভিন্ন রূপ। এই খন্ড চিত্রগুলি গড়তে ও ভাঙতে থাকেন শরীরী ভাষায়, সংলাপের মায়াজালে। কমেডির মোড়কে। হাসতে-হাসতে, হাসাতে-হাসাতে জড়তাহীন বিশ্বাসে বলে দেন, ‘আসলে সমাজটাই তো টক্সিক, বিষাক্ত।’ আমরা মুখ ঢেকে রেখেছি ভদ্রতার মুখোশে। এই শিষ্টাচারটাই আর এক রকমের মাদক। তাই আমরা সবাই ‘পিয়াক্কড়’। নেশাগ্রস্ত। আসল পরিণতিটা একই। কেউ নিয়তিতে নেশাগ্রস্ত, কেউ নীতিহীনতায়।
প্রিয়ব্রত দত্ত