রাজ্যে সবেমাত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডবল ইঞ্জিন সরকার। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট জমানা শুরু হতেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ডবল ইঞ্জিন সরকার বিদায় নিয়েছিল। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় পাঁচ দশক। ফের ডবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হতেই আশায় বুক বাঁধছে রাজ্যবাসী। অনেকের ধারণা, এতকাল সিঙ্গল ইঞ্জিন সরকার ছিল বলেই বাংলাকে ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় দূর, লাগাতার সংঘাতের পরিবেশ রাজ্যবাসীর জীবনে নানা দুর্দশা নামিয়ে এনেছে। এবার এসব অতীত হবে এবং ডবল ইঞ্জিন মানে ডবল সুরাহা। কিন্তু এই সরকারের শুরুটা মানুষের জন্য আদৌ শুভ হল কি? বুলডোজার বিতর্ক থামেনি। তার মধ্যে জারি রয়েছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। এরপর আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড় বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মাথায়। নতুন সরকার রাজ্যজুড়ে ২ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তাই জেগেছে এই সংগত প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর সম্প্রতি কলকাতায় এসে জানিয়ে দিয়েছেন, এই ব্যবস্থা চালু হয়ে যাবে জুলাই মাসেই। অতএব কাজটি এগোবে দ্রুতগতিতেই।
কিন্তু স্মার্ট মিটার কতটা গ্রাহক সহায়ক? এই ইস্যুতে কেন্দ্রের নানাবিধ বক্তব্যে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তার উপর রয়েছে তৃণমূল জমানায় পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে উত্তর ২৪ পরগনার কয়েকটি এলাকায় স্মার্ট মিটার বসানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা। তাতে গ্রাহকের সুরাহা দূর, সামনে এসেছিল বরং বাড়তি খরচের বোঝা। বিদ্যুৎ বিল এসেছিল কয়েকগুণ এবং মিটার ভাড়াও অনেক বেশি। স্মার্ট মিটারের আয়ুও অনেক কম। স্বভাবতই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরোদস্তুর। সাম্প্রতিক অতীতের অন্য তুলনাও সামনে আসে এখন। স্মার্ট মিটারের খরচ বৃদ্ধি নিয়ে গতবছরই হুঁশিয়ার করেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা এবং আজকের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিরোধী নেতা হিসাবে তখন তাঁর বক্তব্য ছিল, মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে শেষ করে দেওয়ার জন্যই জোরপূর্বক স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে। কোথাও স্মার্ট মিটারের টেস্ট কেস চলছে। কোথাও আবার তা বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সরাসরি! শুভেন্দু এরপরই বিদ্যুৎ আইনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। অতঃপর নথি তুলে ধরে দাবি করেন, স্মার্ট মিটার বসানো বাধ্যতামূলক নয়। এই প্রসঙ্গে রেগুলেটরি কমিশনের ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিলের নির্দেশিকা উদ্ধৃত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রেগুলেটরি কমিশনের নির্দেশিকা অনুসারে স্মার্ট মিটার বসানো বাধ্যতামূলক নয়। বসানো অথবা না বসানোটা সম্পূর্ণ গ্রাহকের ইচ্ছা। শুভেন্দুর পরিষ্কার পরামর্শ ছিল, বাড়িতে কেউ জোরপূর্বক স্মার্ট মিটার বসাতে এলে তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন। স্মার্ট মিটার যে আবশ্যিক নয়, এই ব্যাপারে মানুষকে সচেতনত করতে হবে। প্রয়োজনে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রীও জানান, প্রিপেইড স্মার্ট মিটার আবশ্যিক নয়। অন্যদিকে শুভেন্দু সতর্ক করেন এই বলে যে, যাঁরা এই মিটার বসাবেন, তাঁদের ১২ মাসে মেটাতে হবে ১৩ মাসের বিল! শুভেন্দুর আরো অভিযোগ ছিল, তৃণমূল (রাজ্যের তৎকালীন শাসক দল) ২০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে জোর করে স্মার্ট মিটার বসাচ্ছে। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা সব মিলিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এটাই বুঝিয়েছিলেন যে, স্মার্ট মিটারে খরচ বেশি।
আজকে অ্যাবেকা আরো সতর্ক করছে, স্মার্ট মিটারের ক্ষেত্রে দিনের বিভিন্ন সময়ের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী একাধিক রেট চালুর কথা বলছে মোদি সরকার। যে-সময় বিদ্যুতের চাহিদা সর্বত্র বেশি, তখন গ্রাহককে বেশি মাশুল গুনতে হবে। অর্থাৎ, কারখানার বোঝা চাপবে গৃহস্থের উপর। পালাবদলের পর কী এমন ঘটে গেল যে শুভেন্দু অধিকারী উলটো সুর ধরলেন? গতবছর তিনি ছিলেন বিরোধী দলনেতা আর আজ তিনি মুখ্যমন্ত্রী, মানে রাজ্যের সর্বশক্তিমান। মানুষের স্বার্থে আগে যা যা করতে পারতেন না, আজ তার সবকিছুই তাঁর নাগালে। স্মার্ট মিটার জিনিসটা আগে খারাপ হয়ে থাকলে আজও তা খারাপ। খারাপ জিনিস হঠাৎ ভালো হয়ে যাবে কোন জাদুতে? এখন তিনি কোন যুক্তিতে বলছেন, ২ কোটি গ্রাহকের বাড়িতে দ্রুত স্মার্ট মিটার বসবে আর দ্বিতীয় ধাপে সব স্মার্ট মিটার প্রিপেইড করে দেওয়া হবে? ভাবা যায়, প্রথম ধাপে সরকারি কর্মীদের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর জন্য শুভেন্দুর সরকার ইতিমধ্যে বিজ্ঞপ্তিও জারি করে দিয়েছে! এরপর যে সাধারণ গ্রাহকদের পালা, এ তো সহজ অনুমান। সাড়ে চারশো টাকায় রান্নার গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি কিন্তু এখনো পূরণ হয়নি। অগ্নিমূল্যের বাজারে নয়া ধাক্কা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিদ্যুৎ। সব মিলিয়ে ডবল ইঞ্জিন মানে ডবল দুর্ভোগ হতে যাচ্ছে না কি?