


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘ওরা কেউই স্থানীয় নয়। কথা বলছিল হিন্দিতে। চাপা গলায়।’ মুঠোফোনেও রতন সিংয়ের গলায় আতঙ্কের রেশ। এরপর? প্রায় ফিসফিসিয়ে রতন বললেন, ‘সব শেষ দাদা। অনেক অচেনা মুখ। গুজব ছড়াচ্ছে হাওয়ার গতিতে। মণিপুরকে শেষ করছে ওরা।’ ডাকাবুকো ডিফেন্ডারের গলায় দলা পাকানো কান্না। আপশোস, হাহাকার শুধু রতন সিংয়ের নয়। ‘ডবল ইঞ্জিন’ মণিপুরের এক ছবি। বাজার, দোকান বন্ধ হামেশাই। ইন্টারনেট চালু মানে হাতে চাঁদ পাওয়া। ফুটবল এই রাজ্যের প্রাণ। তোম্বা, জেমস, বেমবেম দেবীর রাজ্যে বেশিরভাগ ফুটবল ক্যাম্পই বন্ধ। কোন বাবা-মা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফুটবলের পাঠশালায় পাঠাবেন বাচ্চাদের? ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে হিংসায় উন্মত্ত চিত্রাঙ্গদার ভূমি। কুকি, মেইতেই, নাগা জনগোষ্ঠীর হানাহানি নিত্য ঘটনা। অথচ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসন। ইস্ট বেঙ্গলে খেলে যাওয়া লেফট ব্যাক রতন বিড়বিড় করছেন-‘দাঙ্গা থামানোর ইচ্ছাই নেই সরকারের। লাশ পড়ছে রোজ। সবাই নির্বিকার।’
তোম্বা সিং, জেমস সিংদের একই দশা। ভাসুমকে নিশ্চয়ই ভোলেনি কলকাতা ময়দান। উখরুলে ভাসুমের পাড়ায় ইন্টারনেট বন্ধ দীর্ঘদিন। দিনের বেলা কিছুক্ষণ দোকানপাট খোলা থাকছে। লাল-হলুদ জার্সিতে ডিফেন্ডারদের তোয়াক্কা করতেন না পাহাড়ি ফুটবলার। সেই ভাসুমের গলাতেও আতঙ্ক। বললেন, ‘ভিটে আঁকড়ে পড়ে আছি কোনোরকমে। কাউকে বিশ্বাস করা দায়। সর্বত্র অবিশ্বাস। মিস করি কলকাতাকে।’ আরেক ফুটবলার থই সিংও ক্ষুব্ধ। খুদেদের ক্যাম্প নিয়ে খুশিতেই ছিলেন। রোজের দাঙ্গায় দফারফা সবকিছুই। গলায় আগুন ঢেলে থই বললেন, ‘কেন্দ্র চালাচ্ছে বিজেপি। ইচ্ছা থাকলে ৫ মিনিটে দাঙ্গা রোখা যায়। আসলে অশান্তি জিইয়ে রাখলেই ওদের লাভ।’ মোহন বাগানের প্রাক্তনী জেমস সিং এখন ডিব্রুগড়ে কোচিং করান। দুই ছেলেকে কলকাতার কোনও আবাসিক শিবিরে ভরতি করাতে মরিয়া। শান্তি ফেরাতে প্রশাসনে চিঠি দিয়ে দরবার করেছেন মেরি কম, বেমবেম দেবী, চানুরা। লাভের লাভ কিচ্ছু হয়নি। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিই সার। ডবল ইঞ্জিনের মণিপুরে কান পাতলেই এখন শোনা যায়— এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।