সংবাদদাতা, কাটোয়া: ভোর হলেই তাঁদের ব্যস্ততা শুরু। সংসারের কাজ সারতে হয়। রান্না থেকে ছেলেমেয়েকে স্কুল পাঠানো, বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল। সব সামলে নিজেদের শিল্পসত্তায় কাজ করে চলেছেন আউশগ্রাম, পূর্বস্থলীর ‘দশভুজা’রা। কেউ ডোকরার গয়না তৈরি, কেউ আবার কাঠের পুতুল সহ নানা সামগ্রী প্রস্তুত করেন। আবার কেউ কাঁথাস্টিচের কাজ করেন। বিদেশেও সমাদৃত হচ্ছে তাঁদের কাজ।
আউশগ্রাম-১ ব্লকের দারিয়াপুরে ডোকরাপাড়ায় সকাল হলেই ছেলে-স্বামীর রান্না করতে হয় পূজা কর্মকারকে। তারপর সংসারের নানা কাজ সামনে গয়না তৈরি করতে বসেন। সারাদিন সংসারের দায়িত্ব সামলেও নিজের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ডোকরার গয়না তৈরি করেন। পূজার হাতের তৈরি ডোকরার গয়না দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে। প্রতিদিন অনেকে গুসকরা শহর সংলগ্ন ডোকরাপাড়ায় গয়না কিনতে আসেন। পূজা বলেন, মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। সংসারের কাজের সঙ্গে ডোকরার গয়না তৈরি থেকে সব কাজ করি।
পূর্বস্থলী-২ ব্লকের পিলা অঞ্চলের নতুনগ্রাম বহু বছর ধরেই কাঠপুতুলের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার পূর্বপুরুষের আমল থেকেই কাঠের পেঁচা তৈরির শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। এখানকার শিল্পীদের কাঠের নানা পুতুল রাজা-রানি, গৌর-নিতাই, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা তৈরি করেই সংসার চালান। এখানকার শিল্পীদের তৈরি কাঠের ‘রাশিয়ান ডল’ স্পেনের মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। কাঠের কাজে পিছিয়ে নেই মহিলারাও। পুরুষদের পাশাপাশি নতুনগ্রামের মহিলারাও নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছেন। রিঙ্কু ভাস্কর, পূর্ণিমা ভাস্কর, নন্দরানি ভাস্কররা বলেন, আমরা সংসারের কাজকর্ম সেরে কাঠের তৈরি নানা মডেলে রং করি। নতুন নকশা তৈরি করি। আমাদের হাতের কাজ বিদেশেও যাচ্ছে।
আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের ওয়ারিশপুর, বননবগ্রাম, আলেফনগর, বাগরাই, আউশগ্রাম, সোমাইপুর, ভেদিয়া সহ নানা গ্রামের মহিলারা কাঁথাস্টিচের শাড়ি, পাঞ্জাবি, কুর্তি, বিছানার চাদর তৈরি করেন। গ্রামের মহিলারা বহু বছর ধরে কাঁথাস্টিচ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। কেউ মা-কাকিমার হাত ধরে শিখেছেন কাপড়ের উপর সুতোর নকশার এই কাজ। কেউ আবার বিবাহসূত্রে গ্রামে এসে প্রতিবেশীদের দেখে কাঁথাস্টিচের কাজ শিখেছেন। সুচ-সুতো নিয়ে বসে শাড়িতে নকশা ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা। তার ফাঁকেই চলে ছেলেমেয়েদের পড়ানো, সংসারের অনান্য কাজ। বেঙ্গালুরু সিল্ক বা তসরের শাড়ির উপর নানা সূক্ষ্ম কারুকার্য ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা। এখানকার শিল্পীরা ডেনমার্ক ঘুরে এসেছেন। ওয়ারিশপুরের শিল্পী বুল্টি বিবি বলেন, ডেনমার্কের শিল্পীরা উলের নানা পোশাক বোনেন। আমাদের কাছে কাঁথাস্টিচ বোনা শেখেন।
মহিলারা আত্মনির্ভর হচ্ছেন। তাঁদের তৈরি কাজগুলি বিদেশের বাজারেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক নারীদিবসে এসব গ্রামের নারীরা যেন ‘দশভুজা’ হয়ে উঠেছেন। পূজা-বুল্টিদের দেশে এগিয়ে আসছেন গ্রামের অন্যান্য মহিলারাও।