


পরামর্শে সল্টলেক মাইন্ডসেট ক্লিনিকের সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
স্ট্রেস বা উদ্বেগ খুব রিপিটেটিভ প্যাটার্নে আসে। একবার স্ট্রেস-এ আক্রান্ত ব্যক্তি বারংবার স্ট্রেস-এর শিকার হতে থাকেন। এক ধরনের স্ট্রেস অন্য স্ট্রেসকে ডেকে আনে। মস্তিষ্কের অন্দরে স্ট্রেস তৈরি করে গুজব! স্ট্রেসের অভিঘাত হয় অনেক বেশি। স্ট্রেস নিয়ে অনুক্ষণ ভাবতে থাকেন একজন ব্যক্তি। এই বিরামহীন ভাবনাতেই দরকার পড়ে ছেদ-এর। এমন উদ্বেগজাতীয় সমস্যার আদর্শ সমাধান হতে পারে স্ট্রেচিংয়ের মতো এক্সারসাইজ।
হাঁটাহাঁটি কীভাবে স্ট্রেস কমায়?
হাঁটাহাঁটি সবসময় স্ট্রেস বাস্টার। নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও তার প্রমাণ মিলেছে। একটি গবেষণায় ষাটোর্ধ্ব মানুষের দু’টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। একটি গ্রুপের মানুষকে রোজ ১ বছর ধরে হাঁটতে বলা হল। আর একটি গ্রুপের মানুষকে বলা হল ১ বছর ধরে হালকা কিছু ব্যায়াম করতে। গবেষণা শুরুর আগে এই দু’টি গ্রুপের মানুষেরই ফাংশনাল এমআরআই করা হল। ঠিক এক বছর পরে ফের এই দুই গ্রুপের মানুষের এমআরআই করা হল। দেখা গেল, যে গ্রুপটি হাঁটাহাঁটি করেছে, সেই গ্রুপটির মস্তিষ্কের মধ্যে টেম্পোরাল লোব, ফ্রন্টাল লোব এবং প্যারাইটাল লোবের মধ্যে যোগাযোগ অনেক বেশি পোক্ত হয়েছে বা বেড়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন হল তাতে সুফল কী? অ্যামিগডালা নামের অংশ মস্তিষ্কে উদ্বেগ তৈরি করে। তাকে শান্ত করতে ব্রেনের ‘গুরু মস্তিষ্ক’ বা ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ থেকে নির্দেশ আসা জরুরি। সেই নির্দেশের জায়গাটি অনেক বেশি পোক্ত হয় হাঁটাহাঁটি করলে। সোজা কথায় যাঁরা স্ট্রেস-এ পড়েন বা যাঁদের স্ট্রেস-এ আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি অত্যন্ত উপকারী।
কাইনুরেনিনের খেলা!
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যাচ্ছে। তা হল, কাইনুরেনিন বলে একটি বিশেষ যৌগ রয়েছে যার বিপাক বাড়ে স্ট্রেস বাড়লেই। অ্যালঝাইমার্স, পার্কিনসনস ডিজিজ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসের মতো শারীরিক জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে কাইনুরেনিন। এক্ষেত্রেও গবেষণায় মিলেছে চমকপ্রদ তথ্য। তা হল, আমাদের শরীরের মাংসপেশিগুলির সংকোচন প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রেনের একটি অংশ। দেখা গিয়েছে প্রবল স্ট্রেস-এর সময় মাংসপেশির সংকোচন প্রসারণ বাড়ানো গেলে কাইনুরেনিনের ক্ষরণ কমানোও সম্ভব। প্রশ্ন হল, কীভাবে হাঁটাহাঁটি করলে তবে শরীরে এমন পরিবর্তন ঘটে?
গ্রহণযোগ্য মতটি হল, আমরা একসময় চতুষ্পদ প্রাণী ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতেই আমরা দ্বিপদ হয়েছি। ফলে হাঁটাহাঁটি করলে প্রাকৃতিক উপায়েই আমাদের স্ট্রেস কমতে থাকে। তাই যেসব মানুষ আয়াসি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ও হাঁটাহাঁটি একেবারেই কম করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই মেকানিজম খুব কম কাজ করে। তাই স্ট্রেস বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটাও খুব বড় কারণ হতে পারে।
এছাড়া আমাদের ব্রেনে রয়েছে গাবা নামের একটি নিউরো ট্রান্সমিটার বা স্নায়ু যৌগ। গাবা নামের এই স্নায়ু যৌগ আমাদের মস্তিষ্ককে শান্ত হতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে স্ট্রেস মানেই হল উত্তেজনা। সেক্ষেত্রে গাবার ক্ষরণ বেশি হলে স্ট্রেস কম হবে। এক্ষেত্রেও দেখা যায়, যে ব্যক্তি নিয়মিত যথেষ্ট মাত্রায় হাঁটাহাঁটি করেন, তাঁর মস্তিষ্কে গাবার নিঃসরণও বাড়তে থাকে।
কতটা হাঁটবেন?
এবার প্রশ্ন হল, কী ধরনের হাঁটাহাঁটি স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে? তার কি কোনও গাইডলাইন আছে?
হাঁটাহাঁটির গাইডলাইন
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, স্ট্রেসের সঙ্গে হার্টের কাজকর্মের একটা বড় যোগাযোগ আছে। আমরা সকলেই জানি, স্ট্রেস বাড়লে ব্লাড প্রেশার বাড়ে। আবার হার্টের ভালভের কাজকর্মের সঙ্গেও ক্রনিক স্ট্রেসের সম্পর্ক আছে বলে জানা যাচ্ছে কিছু গবেষণায়।
সেক্ষেত্রে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইন অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। এই সংস্থা জানাচ্ছে ব্রিস্ক ওয়াকিং-এ মিলতে পারে সঠিক ফলাফল। এখন ব্রিস্ক ওয়াকিং একটি ‘ভেগ’ বা ফাঁপা শব্দ! কারণ হাঁটাহাঁটি ঠিক কীভাবে করলে সঠিক ফলাফল মিলতে পারে, তার ক্ষেত্রটি যথেষ্ট বৃহত্।
বলা হচ্ছে, এমনভাবে হাঁটতে হবে যাতে ব্রেন এবং হার্টে সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন হতে পারে। তার জন্য দেখতে হবে, হাঁটাহাঁটির সময়ে কথা বলাতে গিয়ে যদি দেখা যায় বেশ কষ্ট হচ্ছে বা কথা বলার জন্য আলাদা করে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে অথবা অনেকটা শ্বাস টেনে তারপর কথা বলতে হচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে আপনি সঠিকভাবে হাঁটছেন। আর হাঁটাহাঁটি করতে করতেই কথা বলতে গিয়ে যদি একজন ব্যক্তি গান করতে পারেন, নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারেন, তাহলে তা হাঁটা নয়। বরং সেটা লাইট এক্সারসাইজ। আরও একটা বড় মাপদণ্ড আছে। তা হল, যদি একজন শারীরিকভাবে সুস্থ ব্যক্তি হেঁটে প্রতি ৯ মিনিটে ১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারেন তাহলেও কাজ হবে।
সকাল নাকি বিকেল, কখন হাঁটবেন?
নিশ্চিতভাবে মর্নিংওয়াক খুবই ভালো। এই সময়ে অন্যান্য চিন্তাভাবনাগুলো মনে হানা দেয় না। দিনের কাজগুলি তখনও শুরু হয় না। দূষণও কম থাকে। ফলে মন শান্ত করে দূষণহীন পরিবেশে অনেক
সময় ধরে হাঁটা সম্ভব। এছাড়া সকালের সূর্যালোক গায়ে লাগালে ত্বকে ভিটামিন ডি-এর সংশ্লেষ হয়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সেইদিক থেকে বললে সকালে হাঁটা সবসময় বেশি উপকারী। অবশ্য তার মানে এই নয় যে যিনি সকালে কাজ শুরু করেন, তিনি আর বিকেলে হাঁটতে পারবেন না বা বিকেলে হাঁটলে কোনও কাজ হবে না। ইভনিং ওয়াকেও কাজ হয়। যাঁদের একেবারেই সময় নেই, তাঁরা বরং বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ড হেঁটে যান। কিংবা অফিস থেকে ফেরার সময় বাড়ির বাস স্টপে নামার আগে একটা দুটো স্টপ আগে নেমে পড়ুন। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরুন। দেখবেন ঠিক কাজ হচ্ছে। অতএব হাঁটুন। রোজ হাঁটুন। কমিয়ে ফেলুন স্ট্রেস।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক