Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

তীব্র গ্রীষ্মে টক খেলে কি গরম কম লাগে?

গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। তোলা জলে স্নান করে শান্তিপুরের বাড়ির বারান্দায় বসলেন অবনীবাবু। বসতে না বসতেই গায়ে ঘাম! ভেজা গামছা দিয়েই কপাল মুছলেন অবনীবাবু। মাথার উপর পাখা ঘুরছে বটে, তবে গুমোট গরম যেন পিছু ছাড়ে না। এমন সময় গিন্নি এক বাটি পাতলা করে বানানো কাঁচা আমের টক ডাল আর একটু গন্ধরাজ লেবু নিয়ে এলেন।

তীব্র গ্রীষ্মে টক খেলে কি গরম কম লাগে?
  • ২ মে, ২০২৬ ০৯:০৫
Prefer us on Google

একটু বয়স্করা বার বার বলেন, গরমে টক খেলে নাকি গায়ে রোদ লাগে না, শরীর ঠান্ডা থাকে! সত্যিই কি তাই? উত্তর দিলেন বসিরহাট স্বাস্থ্য জেলার স্বরূপনগর ব্লকের কমিউনিটি হেলথ অফিসার (আয়ুষ) ডাঃ নীলাদ্রি বসু। 

Advertisement

গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। তোলা জলে স্নান করে শান্তিপুরের বাড়ির বারান্দায় বসলেন অবনীবাবু। বসতে না বসতেই গায়ে ঘাম! ভেজা গামছা দিয়েই কপাল মুছলেন অবনীবাবু। মাথার উপর পাখা ঘুরছে বটে, তবে গুমোট গরম যেন পিছু ছাড়ে না। এমন সময় গিন্নি এক বাটি পাতলা করে বানানো কাঁচা আমের টক ডাল আর একটু গন্ধরাজ লেবু নিয়ে এলেন। আর ছোট মেয়ে দিয়ে গেল কাঁসার থালায় গরম ভাত, পাশে একটু আলু চোখা। লেবুতে চাপ দিতেই ভাতের উপর রস ছড়িয়ে পড়ল। এবার একটু ভাত ভেঙে ডাল আর আলু চোখা দিয়ে মেখে খেতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। তড়িঘড়ি ডালের বাটিতে একটু চুমুক দিতেই শরীরের জ্বলুনি যেন কেটে গেল নিমেষে। অবনীবাবু ভাবছিলেন, এই যে প্রখর তাপে শরীর যখন পুড়ে যাচ্ছে মনে হয়, ঠিক তখনই টক কেন অমৃতের মতো লাগে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে।
গ্রীষ্মের তাপে টক খাবার: উপকার না অপকার?
গরমে বাংলার লেবু, টক ডাল বা জলপাইয়ের টক যেন খাবারের প্রাণ। তবে আয়ুর্বেদ অনুসারে টক বা ‘অম্ল রস’ হল দ্বিমুখী তলোয়ার। এমন খাদ্য যেমন উপকারী, অতিরিক্ত হলে তেমনি ক্ষতিকর।
অম্ল রস কী?
আয়ুর্বেদ মতে, টক স্বাদ তৈরি হয় ‘পৃথ্বী’ ও ‘অগ্নি’ মহাভূত দিয়ে। এর গুণ হলো উষ্ণ, স্নিগ্ধ ও লঘু। অম্ল রস বায়ু বা বাত প্রশমন করে গ্যাস ও শরীরের শুষ্কতা কমায়, কিন্তু অতি সেবনে পিত্ত ও কফ বাড়িয়ে দেয়।
গ্রীষ্মে শরীরের পরিবর্তন
গ্রীষ্মকালে আমাদের শরীরে পিত্ত দোষ সঞ্চিত হয়। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর জল ও লবণ বেরিয়ে যায়। ফলে ‘অগ্নি’ বা হজমশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্লান্তি ও অরুচি দেখা দেয়। এই সময় শরীরের জন্য শীতল, হালকা ও পিত্ত-প্রশমক খাদ্য প্রয়োজন।
পরিমিত টক খাওয়ার উপকারিতা
পরিমিত টক খাবার এই সময় মহৌষধের মতো কাজ করে। মুখে লালা নিঃসরণ বাড়িয়ে রুচি ফেরায় এবং হজমশক্তি সক্রিয় করে পেটের গ্যাস বা ফাঁপা ভাব কমায়। টক ও লবণের সংমিশ্রণ শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রেখে ক্লান্তি দূর করে ও সতেজতা আনে।
অতিরিক্ত টকের ক্ষতি
বেশি টক খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। অম্বল, বুক জ্বালা, ত্বকের র‍্যাশ বা অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের আলসার বা পিত্ত প্রকৃতি বেশি, তাদের জন্য অতিরিক্ত টক ক্ষতিকর।
প্রিয় টক খাবার
১. জলপাই টক: হজমে দারুণ সহায়তাকারী। তবে এই টকে চিনি বা গুড় মিশিয়ে ভারসাম্য আনা জরুরি।
২. টক ডাল: কাঁচা আম দিয়ে তৈরি পাতলা ডাল শরীর ঠান্ডা রাখে এবং লবণের ঘাটতি পূরণ করে।
৩. কাগজি লেবু: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ালেও খালি পেটে খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে অ্যাসিডিটি বাড়তে পারে।
৪. দই: গ্রীষ্মে সরাসরি দই খাওয়ার চেয়ে ‘ঘোল’ বা ‘তক্র’ খাওয়া উত্তম, কারণ এটি হালকা ও পিত্ত-শামক।
খাওয়ার সঠিক নিয়ম
আয়ুর্বেদ বলে, টককে প্রধান খাদ্য না করে সহায়ক হিসেবে অল্প পরিমাণে গ্রহণ করুন। এটি দুপুরে পাতলা করে খাওয়া সবচেয়ে ভালো। আচার, তেঁতুল বা রাতে দই খাওয়া এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পরিশেষে বলা যায়, আয়ুর্বেদ মতে গ্রীষ্মের মূল নীতি হলো ‘মধুর, তিক্ত ও কষায়’ রসের প্রাধান্য। তবে সঠিক পরিমাণে ও নিয়ম মেনে খেলে টক খাবার আপনার হজম ও রুচি বাড়িয়ে শরীরকে সতেজ রাখবে। মনে রাখবেন— অল্পে উপকার, বেশি হলে অপকার। 

সম্পর্কিত সংবাদ