Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ডাক্তারদের চেষ্টায় মা ও শিশুর পুনর্জন্ম রানাঘাট হাসপাতালে

বিয়ের পর দীর্ঘ প্রায় একযুগ অপেক্ষার পর প্রথমবার মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চলেছিলেন শর্মিলা দাস (৩১)। প্রথম কয়েকমাস সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল।

ডাক্তারদের চেষ্টায় মা ও শিশুর পুনর্জন্ম রানাঘাট হাসপাতালে
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৫:০২
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: বিয়ের পর দীর্ঘ প্রায় একযুগ অপেক্ষার পর প্রথমবার মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চলেছিলেন শর্মিলা দাস (৩১)। প্রথম কয়েকমাস সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তার পর থেকে শুরু হয় একের পর এক শারীরিক জটিলতা। জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েন শর্মিলা। কোনওরকমে সন্তানের জন্ম দিলেও মা ও সদ্যোজাতের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকে। শেষপর্যন্ত রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় দু’জনেই ফিরেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। আপাতত সদ্যোজাত ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় শর্মিলা।

Advertisement

নদীয়ার গাংনাপুরের হুমানিয়াপোতার বাসিন্দা শর্মিলা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। সেই সময় তিনি ছিলেন প্রায় ৩০ সপ্তাহের গর্ভবতী। উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট এবং রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তাঁকে দ্রুত ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। চিকিৎসকরা ওষুধের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছিল না কিছুতেই। প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক অভিরূপ নস্কর বলছিলেন, ‘রোগী সিভিয়ার প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া ও জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। মাত্র ৩১ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা ছিল। পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যাও ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঝুঁকি নিয়েই ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’
সেদিন রাত প্রায় আটটা নাগাদ তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় তাঁর রক্তচাপ ছিল প্রায় ২২০/১৪০, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কমপক্ষে ৩৭ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা ছাড়া ডেলিভারি এমনিতেই বিরল। তার ওপর প্রসূতি মায়ের এত রকমের শারীরিক জটিলতা তাঁকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। চিকিৎসকদের তৎপরতায় রাতেই জন্ম নেয় এক কিলো ন’শো গ্রাম ওজনের পুত্রসন্তান। অপরিণত অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গেই  সদ্যোজাতকে সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে (এসএনসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে উপযুক্ত মেডিকেল সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয় তাকে। যা একটি মহকুমাস্তরের হাসপাতালের কাছে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। 
এদিকে, প্রসবের পর প্রথমে মায়ের শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও পরদিন ভোরে আচমকাই অবনতি ঘটে। তাঁর ফুসফুসে জল জমতে শুরু করে। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে আসে তিরিশের ঘরে। তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শর্মিলাকে দ্রুত ভেন্টিলেশনে রেখে নিবিড় পরিচর্যা শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় এমন অবস্থাকে ‘নিয়ার মিস মাদার’ বলা হয়। অর্থাৎ, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মা।
হাসপাতালের সুপার প্রহ্লাদ অধিকারী জানান, অপারেশনের পর এইচডিইউ’তে স্থানান্তর এবং পরবর্তী চিকিৎসা ছিল অত্যন্ত কঠিন। সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও চিকিৎসক, অ্যানাস্থিসিস্ট, নার্সিং স্টাফ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিবিড়ি সমন্বয় রেখে কাজ করেছেন বলেই এই সাফল্য মিলেছে। হাসপাতালের অ্যানাস্থিসিস্ট কৌশিক দাসের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিন দিন পর্যবেক্ষণের পর শর্মিলার অবস্থার উন্নতি হয়। বর্তমানে তিনি বিপন্মুক্ত। শিশুটিও চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে স্থিতিশীল রয়েছে। শর্মিলার স্বামী প্রবীর মুন্ডা, পেশায় প্যান্ডেল মিস্ত্রি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘এক সময় মনে হয়েছিল স্ত্রী আর সন্তান, দু’জনকেই হয়তো হারাব। ডাক্তারবাবু ও নার্সদের জন্যই আজ ওরা দু’জনেই আমাদের কাছে ফিরে এসেছে।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ