


সামনেই কালী পুজো। সুমির তাই উত্তেজনার শেষ নেই। বাজির লিস্ট তৈরি করে ফেলেছে সে ইতিমধ্যেই। নোটবইতে সেই তালিকা তোলাও হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু মায়ের কাছে আবদার করা বাকি। লিস্টখানা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে সময় সুযোগ মতো, মায়ের মুড বুঝে। তারপর পুরোটাই তাঁর হাতে। মোটামুটি দিন দুয়েক বাদে মাকে বাজি তালিকা জানাতেই তাঁর চোখ কপালে উঠল। বিশাল তালিকা থেকে কাটছাঁট করে একটা ফাইনাল লিস্ট তৈরি করলেন তিনি। তারপর মেয়ের সঙ্গে কিনতে বেরলেন বাজি। সবই আলোর বাজিই। শব্দে মা-মেয়ে দু’জনেরই অ্যালার্জি। তাই শব্দবাজি নাকচ। সবই ফুলঝুরি, তুবড়ি, রংমশাল, বাটারফ্লাই ক্র্যাকার, কিছু রকেট, চড়কি, ইলেকট্রিক তার ইত্যাদি।
কালী পুজো আর বাজি শব্দ দুটো একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক প্রসঙ্গ উঠলে অন্যটার উল্লেখ হবেই। আর বাজি পোড়ানোর আনন্দ সব বাধা নিষেধকে ছাপিয়ে যায়। এক বাঁধনছাড়া ভালোলাগায় আমরা হইহই করে বাজি পোড়ানোয় মেতে উঠি। তবু কিছু সতর্কতা প্রয়োজন, জানালেন স্কিন থেরাপিস্ট অর্চনা নায়েক। তাঁর কথায়, বাজি পোড়ানোর ক্ষেত্রে যেটা সবার আগে মনে রাখা জরুরি তা হল কিছু সর্তকতা মেনে চলা। আনন্দের চোটে হয়তো আমরা খানিক বেপরোয়া হয়ে পড়ি, কিন্তু তা করলে চলবে না। মূলত চুল ও ত্বকের দিকে খেয়াল রাখতে হবে বাজি পোড়ানোর সময় ও তারপর। এছাড়াও রয়েছে পোশাক, জুতো ইত্যাদি সংক্রান্ত সচেতনতা।
সাধারণ সাবধানতা
কাপড়ের জুতো পড়ে বাজি পোড়ানো সবচেয়ে ভালো। তার মধ্যে পা ঢাকা জুতো হলে আরও ভালো। তবে স্লিপ অন বা পা গলানো ঢাকা জুতোই পরাবেন আপনার সন্তানকে, ফিতে বাঁধা পা ঢাকা জুতো নয়। কোনও কারণে যদি হঠাৎ জুতো খুলে ফেলতে হয় তাহলে স্লিপ অন জুতোয় তা অনায়াসে করা যাবে।
পোশাকের ক্ষেত্রেও সুতি মাস্ট। ঢিলে পোশাক, অনায়াসে খোলা যায় এমন পোশাক বাছুন আপনার শিশুর জন্য। গা ঢাকা পোশাক হওয়া চাই। মানে ফুল হাতা টপ, ফুল প্যান্ট ইত্যাদি হলেই ভালো। টাইট ফিটিং পোশাক কিন্তু এই দিনের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়।
খোলা জায়গায় বাজি পোড়াতে বলুন আপনার বাচ্চাকে। একদল কচিকাঁচাকে একা একা ছেড়ে দেবেন না। বড় কেউ একজন বাজি পোড়ানোর জায়গায় অবশ্যই থাকবেন। বড়দের তত্ত্বাবধান বা দেখভাল ছাড়া বাচ্চারা যেন কখনওই বাজি না পোড়ায় ।
ত্বক নিয়ে সচেতন
অর্চনা জানালেন, ত্বকের বিভিন্ন ধরন থাকে। খুব স্পর্শকাতর ত্বক, শুষ্ক ত্বক, তৈলাক্ত ত্বক ইত্যাদি। প্রতিটির ক্ষেত্রেই কিন্তু বাজি পোড়ানোর আলাদা আলাদা সতর্কতা। যাদের শুষ্ক ত্বক তারা বাজি পোড়াতে যাওয়ার আগে মুখে হাতে একটা প্রোটেক্টিভ ক্রিম বা লোশন লাগিয়ে নেবেন। এতে বাজির ধোঁয়া, বারুদ ইত্যাদি ত্বকের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে তার ক্ষতি করতে পারবে না। যাদের তৈলাক্ত ত্বক তারা অবশ্যই ত্বকের সুরক্ষার জন্য জেল বা ওয়াটার বেসড লোশন লাগিয়ে নেবেন বাজি পোড়ানোর আগে। শিশুর আঙুলে আংটি বা কানে দুল থাকলে তা খুলে তবেই বাজি পোড়ানো শুরু করা ভালো। হাতে রবার গ্লাভস পরিয়ে দিন বাচ্চাকে। চোখেও প্রোটেকটিভ গ্লাস পরিয়ে পাঠান। বাজি পুড়িয়ে আসার পর মুখ হাত পা ভালো করে ধুয়ে তা শুকনো করে মুছে নিতে হবে। তারপর ত্বকের পক্ষে ভালো ও উপযুক্ত কোনও ক্রিম মেখে নিতে হবে।
যদি বাজি পোড়াতে গিয়ে বাচ্চার গায়ে আগুনের ফুলকি এসে লাগে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে দেখে নিন ত্বক পুড়ে গেল কি না। পুড়ে গেলে সেই জায়গায় ঠান্ডা জল দিন। বেশ খানিক্ষণ রানিং ওয়াটারের ত্বকের যে অংশ পুড়ে গিয়েছে তা ধুয়ে নিন। এরপর সেখানে অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম লাগিয়ে দিন। যদি পোড়া খুব গুরুতর হয় তাহলে অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম লাগানোর পর অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
বাজি যেখানে পোড়ানো হবে সেখানে একটা জল ভরা বালতি রাখুন। পোড়া বাজি সেই জলে ফেলে দিন। তাতে অসতর্কতায় আগুন ধরে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। হাতের কাছে একটা ফার্স্ট এড কিটও রাখা ভালো। তাতে অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম, লোশন, তুলো, ব্যান্ডেইড, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি ছাড়াও টুথপেস্ট, ইয়ার বাড-এর মতো জিনিসও রাখতে হবে।
চুলের যত্ন নিন
আপনার সন্তানের চুল যদি বড় হয় তাহলে বাজি পোড়াতে যাওয়ার আগে তা ভালো করে বেঁধে দিন। বিনুনি, খোঁপা ইত্যাদি বাঁধলে চুল খুলে আসার সম্ভাবনা থাকবে না। চুল বাঁধার আগে জেল বা তেল লাগিয়ে নিন মাথায়। তাতে ধোঁয়া বা বারুদ থেকে হওয়া ক্ষতি তুলনায় কম হবে। এছাড়া বাজি পুড়িয়ে আসার পর সম্ভব হলে চুল খুলে তা ভালো করে মুছে নেবেন। তাতে যেটুকু ধোঁয়া বা বারুদ চুলে লেগে থাকবে তা মুছে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি একটু গরম জলে চুল ধুয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে চুল সম্পূর্ণ শুকিয়ে ফেলতে হবে নাহলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
বাজি পোড়ানোর সময় হেয়ার স্টাইল করার প্রয়োজন নেই। অযথা মাথায় ক্লিপ, হেয়ার ব্যান্ড ইত্যাদির বাহুল্য রাখবেন না। চুল শক্ত করে বেঁধে রাখার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু সাজই চুলের জন্য যথেষ্ট। যদি সম্ভব হয় তাহলে চুল ঢেকে রাখার জন্য একটা সুতির স্কার্ফ ব্যবহার করতে পারেন।
সন্তানের সঙ্গে থেকে আনন্দ করে বাজি পোড়ান। কিন্তু সতর্ক থাকবেন যেন আপনার বেখেয়ালে কোনও বিপদে পড়তে না হয়। বাজি যেখানে পোড়ানো হচ্ছে সেই জায়গাটা খুবই খোলামেলা হওয়া দরকার। তাছাড়াও সেখানে যেন বাজি ছাড়া আগুনের অন্য কোনও সূত্র না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সন্তানের জামার পকেটে যেন বাজি না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। বাজিতে আগুন দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে বাচ্চাকে সরে আসতে বলবেন। বাজিতে যদি একবারে আগুন না ধরে তাহলে বারবার সেখানে দাঁড়িয়ে আগুন দিতে দেবেন না আপনার শিশুকে। বরং প্রথমে সেখান থেকে সরে এসে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে বলুন, তারপর আবার চেষ্টা করুক। সব সময় সতর্ক থাকতে হবে অভিভাবকদের। দুর্ঘটনা অতর্কিতে ঘটতে পারে। এই সাধারণ সাবধানতাগুলো মেনে চললে দেখবেন আলোর পুজো মায়ায় ভরে উঠবে।
কমলিনী চক্রবর্তী