


সোমনাথ বসু, কলকাতা: ব্রনফিল্ড রো’এর একটি চায়ের দোকান। দোকান না বলে ঠেক বলাই ভালো। সকাল-সন্ধ্যায় নানা ধর্মের মানুষ আসেন। সাম্প্রতিক বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে জোরকদমে। বৈশাখের শুরুতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিধানসভা নির্বাচন। সোমবার সকালে ঠেকে এসেই দোকানিকে কাদের ভাইয়ের হাঁক, ‘গ্যাসের আকাল বলে তো চায়ের দাম বেড়ে গিয়েছে। তাই দুটোকে তিনটে করে দিস। শ্যামদা আর বিনয় আছে।’ এরপরেই দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে আয়েশ করে বসলেন লুঙ্গি পরা কাদের ভাই। মিনিট পাঁচেক পরেই কাচের পুরু গ্লাসে চা চলে এল। চুমুক দিয়েই বিনয়ের প্রশ্ন, ‘কী হবে এখানে? ববিদার মার্জিন কি বাড়বে?’। শ্যামদা একগাল হেসে বিজ্ঞের মত বললেন, ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। ববি কাজ করেছে। তাই ফল নিয়ে ওকে ভাবতে হবে না রে। শুধু মার্জিন কতটা বাড়বে সেটাই দেখার।’ কাদের ভাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। বললেন, ‘বিজেপি ফালতু লাফালাফি করছে। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, আমাদের বন্দর এলাকায় সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে ওঠেবসে। দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে আমরা মোমিনপুর থেকে খিদিরপুরে যাই। আবার ইদের দাওয়াতে অনেক হিন্দু বন্ধু আসে। এটাই তো দরকার। শুধু হিন্দুত্বের তাস খেলে ভোট পাওয়া যায় না।’
শুধু ব্রনফিল্ড রো নয়, বন্দর এলাকার বিভিন্ন আড্ডায় আলোচনার থিম একই। কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র ফিরহাদ হাকিম এখানে ববি নামেই পরিচিত। কাছের মানুষ, কাজের মানুষ। আর বিজেপির প্রার্থী রাকেশ সিং? তাঁর নামে মামলার সংখ্যা গুনতে গুনতে এক হাতের নয়, দু’হাতের কর তিনবার শেষ হয়ে যাবে। অনেক দেরিতে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে। তাই প্রচারও কম। সবচেয়ে বড় কথা, রাকেশ সিংয়ের ইমেজ একেবারেই ক্লিন নয়। কলকাতায় অমিত শাহের রোড শোয়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে তিনি বাঙালির কাছে ভিলেন। সিপিএমের ফৈয়াজ আমেদ খান তাই এই আসনে দ্বিতীয় হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। তাহলে অঙ্কটা কী হল? ফিরহাদ হাকিম হচ্ছেন বিধায়ক। আর সেকেন্ড এবং থার্ড বয়ের জন্য লড়বে বিজেপি ও সিপিএম।
শেষ পাঁচ বছরে বন্দর এলাকায় কাজও হয়েছে প্রচুর। প্রবল বর্ষায় জল জমলেও তা এখন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ববির অনুগত কাউন্সিলারদের চেষ্টার খামতি নেই। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনামাফিক সেজে উঠেছে এলাকা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়ে উপকৃত মহিলারা। যুবসাথীর যুবকরাও এখন সাহসের থলিতে ফুঁ দিয়ে বলতে পারছে, ‘শিরায় শিরায় রক্ত/আমরা দিদির ভক্ত।’
কলকাতা বন্দর বিধানসভার মধ্যে মোট ৮টি ওয়ার্ড আছে (৭৫, ৭৬, ৭৮, ৭৯, ৮০, ১৩৩, ১৩৪ ও ১৩৫)। শেষ তিনটি ওয়ার্ডে মুসলিম ভোটার বেশি। ৭৬ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দু ভোটাররাও বিজেপির থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। অবাঙালি ভোটার বেশি ৭৯ ও ৮০ নম্বর ওয়ার্ডে। কিন্তু তাঁরাও জানেন, রাকেশ সিংকে ভোট দেওয়া মানে অকারণে আঙুলকে চাপ দেওয়া। তাছাড়া জনপ্রিয়তা বলে তো একটা শব্দ আছে। আর এখানেই বাকিদের বলে বলে গোল দিয়ে চলেছেন ইস্ট বেঙ্গল সমর্থক ববি হাকিম। গতবার, অর্থাৎ ২০২১ সালে তিনি ৮০ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির অওধ কুমার গুপ্তাকে। এবার তা আরও বাড়বে।
এসআইআরের পরে বন্দর বিধানসভায় বাদ পড়েছেন মোট ৭৭,৬০৮ জন। তা সত্ত্বেও ঘাবড়াচ্ছেন না ডাকাবুকো ববি। কারণ তিনি জানেন, মানুষের ভালোবাসাই তাঁর সম্পদ। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘প্রচারের সময় দারুণ সাড়া পাচ্ছি। বন্দর বিধানসভাকে আমি হাতের তালুর মতো চিনি। আর ভোটাররাও আমায় ঘরের ছেলে বলে জানে। এবার বিজেপির প্রার্থী অত্যন্ত দুর্বল। তাই জয়ের মার্জিন অবশ্যই বাড়বে।’
এদিকে রাকেশ সিংয়ের বক্তব্য, ‘বন্দর এলাকায় উন্নয়ন হয়নি। হিন্দুরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। তাই লড়াই হবে জোরকদমে।’