নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: দিন হোক কিংবা রাত, এক ফোনেই সিউড়ির যে কোনও প্রান্তে হাজির হন বছর ৫৫-র দীনবন্ধু বিশ্বাস। চোখের পলকে মুশকিল আসানে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক হলেও সর্পবন্ধু হিসেবেই বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সিউড়ির শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের কাছে তিনি রক্ষাকর্তা। দীনবন্ধুবাবু দীর্ঘ ২৮ বছরে নানা প্রজাতির প্রায় ৭ হাজার সাপ ধরে তাদের পুনর্বাসন দিয়েছেন। সেই তালিকায় মোট ৫৬টি অজগর রয়েছে। এছাড়া একাধিক বিষধর সাপও গৃহকর্তাদের বাড়ি থেকে অবলীলায় বস্তাবন্দি করেছেন। তবে, শুধু সাপ ধরা তাঁর মূল লক্ষ্য নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সাপ সম্পর্কে অবগত করে তোলাটাই যেন তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে উঠেছে।
সিউড়ি পুরসভার সেহারাপাড়ার বাসিন্দা দীনবন্ধুবাবু অজয়পুর হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। স্কুলের পড়ুয়াদের নিয়মিত জীবন বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ দেন। তবে এখানেই তাঁর শিক্ষকতার অধ্যায় শেষ হয় না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সহ সাপ নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে তিনি বিশেষ উদ্যোগী। এখনও পর্যন্ত জেলা সহ জেলার বাইরে প্রায় ১৫০টির বেশি সেমিনার করেছেন। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সরকারি মঞ্চ এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছে সাধারণ মানুষদের সচেতন করার কাজ করে চলেছেন। সাপের ছোবলে জখম হলে ওঝা নয়, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পাঠ দেন তিনি। সেইসঙ্গে আতঙ্কের বশে হামলাকারী সাপকে পাকড়াও না করার পরামর্শও দিয়ে থাকেন। জাতীয় বন্যজীব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বনদপ্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নিয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরে দীনবন্ধুবাবু প্রায় সাত হাজার সাপ সহ একাধিক বন্যপ্রাণীও উদ্ধার করেছেন। বর্তমান সময়ে তিনি একাধিকবার পরিত্যক্ত সাপের ডিম উদ্ধার করে কৃত্রিমভাবে ডিম ফুটিয়েছেন। পরবর্তীতে বনদপ্তরের সহযোগিতায় ওই সাপগুলিকে তিনি জঙ্গলে ছেড়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে জখম হওয়া বন্যপ্রাণ উদ্ধার করে ব্যক্তিগত খরচে তার চিকিৎসাও করেন। সুস্থ হয়ে উঠলে একে একে তাদেরও পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করেন। বর্তমান সময়ে তাঁর বাড়িতে চিকিৎসা পাচ্ছে একটি গোখরো সাপ। দীর্ঘ কর্মজীবনে দীনবন্ধুবাবু সাতটি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১০ সালে প্রথমবার তিনি ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন অ্যাওয়ার্ড পান। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সাপ ধরা শুরু হয়। এক দুই করে ২৮ বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। সাপ ধরার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজ জারি রেখেছি। সাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মন ভয়-ভীতি কাজ করে। এই ভয় থেকেই মানুষ নানা ভুল পদক্ষেপ নেয়। কখনও ওঝার কাছে ছুটে যায়। আবার কখনও হামলাকারী সাপ পাকড়াও করে হাসপাতালে ছুটে যায়। এতে বিপদ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। যে কোনও সাপের ছোবলে জখম রোগীকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই আমার লক্ষ্য।