স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সশরীরে কোথাও নেই অপহরণকারী! শুনতে কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও এটাই বাস্তব। জলজ্যান্ত উদাহরণ হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের এক নাবালিকা অপহরণের ঘটনা। কোনো ব্যক্তি সশরীরে এসে তাকে অপহরণ করেনি। তাকে কেউ জোর করে হোটেলে আটকেও রাখেনি। অপহরণের গোটা প্রক্রিয়াটাই সম্পন্ন হয়েছে ভার্চুয়াল মাধ্যমে। স্রেফ মোবাইল ফোনের কারসাজি। সাইবার বিশেষজ্ঞরা এই ‘অভিনব’ কৌশলে অপহরণকে বলছেন, ‘ডিজিটাল কিডন্যাপিং’। হাওড়া (গ্রামীণ) পুলিশ ও রাজ্য পুলিশের সাইবার সেলের তদন্তে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা আরও জেনেছেন, এই ধরনের ডিজিটাল অপহরণের মূল টার্গেট কিশোরীরাই। জগৎবল্লভপুরের একাদশ শ্রেণির পড়ুয়া এভাবেই অপহৃত হয়েছিল। তাকে উদ্ধারের পর দুষ্কৃতীদের এই নয়া কৌশলের পর্দা ফাঁস করতে তৎপর হয়েছে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট।
পুলিশ সূত্রে খবর, গত ৭ সেপ্টেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে পরিচিত একজনের ডাকে নাবালিকা বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস ধরে কলকাতার নিউমার্কেটে আসে। ওই চত্বরেই একটি হোটেলে ওঠে সে। আমেরিকায় তার একটি চাকরির জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে বলে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডিজিটাল অপহরণকারী। কিশোরী হোটেলে ঢোকার পরই অপরিচিত নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের মেসেজ পান তার পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগ পেয়েই তৎপর হয় ‘সিট’। বৃহস্পতিবার নাবালিকাকে উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা। পরবর্তী তদন্তে পুলিশ একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পারে। জানা যায়, ইনস্টাগ্রামে পরিচয় হওয়ার পর নাবালিকার মোবাইল নম্বর নেয় ডিজিটাল অপহরণকারী। কথার ফাঁদে ফেলে নাবালিকাকে সে কার্যত নিজের কথামতো নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। নিজের আধার কার্ড নিয়ে বাড়ি থেকে বেরয় একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী। মোবাইলের সিম রাস্তায় ফেলে দেয়। হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপার অমিত ভার্মা বলেন, ‘দোকান থেকে নিজের আধার দেখিয়েই নতুন সিম নেয় মেয়েটি। নতুন নম্বর শেয়ার করে ডিজিটাল অপহরণকারীর সঙ্গে। এরপর নিজের আধার কার্ড দেখিয়েই সে নিউ মার্কেটের হোটেলে চেক-ইন করেছিল। কোনো ব্যক্তি জোর করে তাকে আটকে রাখেনি। শুধু তাই নয়, হোটেলে চেক-ইন করার পর কেউ তার সঙ্গে দেখা করতেও আসেনি। অপহরণকারীর সঙ্গে অপহৃতের যাবতীয় যোগাযোগ শুধুমাত্র মোবাইলেই।’ নাবালিকা পুলিশকে আরও জানিয়েছে, তাদের মধ্যে কখনও সশরীরে দেখাও হয়নি। এমনকি, ভিডিয়ো কলে কথা হয়নি কখনও। তাহলে কীভাবে হল এই ডিজিটাল অপহরণ? রাজ্য পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাবালিকা নতুন সিমের নম্বর প্রতারকদের সঙ্গে শেয়ার করতেই সেই নম্বরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সাইবার জালিয়াতরা। ওই নতুন নম্বর ব্যবহার করেই মুক্তিপণ চায় তারা। কিন্তু হাতে ফোন থাকা সত্ত্বেও তা ঘুণাক্ষরে টের পায়নি নাবালিকা।
পুলিশ জানিয়েছে, মূলত ১২-১৭ বছরের নাবালিকাদের ডিজিটাল মাধ্যমে ফুঁসলিয়ে হোটেলে ডেকে মুক্তিপণ চেয়ে প্রতারণার নয়া ফন্দি এঁটেছে প্রতারকরা। উত্তর ভারতের একটি সাইবার গ্যাং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। ওই গ্যাং আগে ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে তারাই ভোল বদলে ডিজিটাল অপহরণের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে তদন্তে জানতে পেরেছে ‘সিট’।