সিনেমার সমালোচনা
সিনেমার সমালোচনা
ধুরন্ধর
রণবীর সিং • অক্ষয় খান্না আর মাধবন • সঞ্জয় দত্ত
কয়েক বছরে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে ভারতে যে কত সিনেমা হয়েছে, তা বোধহয় গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু বলিউডে স্পাইদের যেভাবে লার্জার দ্যান লাইফ, সর্বগুণসম্পন্ন দেখানো হয়, আদৌ তারা তেমন? বাস্তব বলছে, গুপ্তচররা শত্রুদেশে বসবাস করে ছায়ার মতো। মিশে থাকে আমাদের মতো একজন হয়েই। সেই সত্যিকারের স্পাইদের গল্প উঠে এসেছে ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায়। যেখানে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে গুপ্তচর নিজেই হয়ে ওঠে জঙ্গিদের সঙ্গী। মুখ বুজে সাক্ষী থাকে দেশের গোয়েন্দা-ব্যর্থতার। একাধিক সত্যি, চেনা ঘটনাকে কল্পনার সুতো দিয়ে বুনেছেন পরিচালক আদিত্য ধর। তবে এই ঘরানার আর পাঁচটা সিনেমার মতো ‘ধুরন্ধর’ নায়কনির্ভর নয়। সরলরৈখিক গল্পও নয়। বরং সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কীভাবে স্থানীয় আন্ডারওয়ার্ল্ড ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে, সেই বিষয়টিই উঠে এসেছে এই সিনেমায়। সঙ্গে রয়েছে সমকালীন রাজনীতি।
কান্দাহার বিমান ছিনতাই, সংসদে জঙ্গি হামলায় ব্যতিব্যস্ত ভারত ঠিক করে পাকিস্তানে এমন একজন চরকে পাঠানো হবে, যে হয়ে উঠবে জঙ্গিদেরই একজন। এই প্রেক্ষাপটে শুরু গল্প। এরপর গল্প চলে যায় করাচির লিয়ারি শহরে। যে শহরে ছড়ি ঘোরায় বালোচ ডন রহমান ডাকাইত। তার দলে শামিল হয় হামজা আলি মাজহারি। কিন্তু মাজহারি আসলে কে? কীভাবে লিয়ারির গ্যাংওয়ারের সঙ্গে জুড়ে যায় ভারত—তাই নিয়ে এগিয়েছে সিনেমার বাকি কাহিনি।
ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক রিসার্চ ওয়ার্ক। এই ছবির ডিটেলিং দেখার মতো। তার সঙ্গে রয়েছে মারকাটারি অ্যাকশন। রক্তপাত, বিস্ফোরণে মাংস ছিটকে যাওয়ার মতো কিছু দৃশ্য গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। রহমান ডাকাইত, পুলিশ এসপি চৌধুরী আসলাম, সাজিদ মীর, ডেভিড কোলম্যান, আজমল কাসব সহ বহু বাস্তব চরিত্রের ছড়াছড়ি এই সিনেমায়। কীভাবে সকলে এক সুতোয় বাঁধা তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যত্ন করে। গ্যাংওয়ার, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, স্বাধীন বালুচিস্তানের জন্য লড়াই এবং ভারত বিরোধী কার্যকলাপ—এতগুলি বিষয়কে দুর্দান্তভাবে সামলেছেন পরিচালক আদিত্য। ডকুমেন্টারির কায়দায় ভারতে জঙ্গি হামলার আসল অডিও-ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। তা ছাপ ফেলেছে দর্শক-মনে।
যোগ্য সঙ্গত করেছে সিনেম্যাটোগ্রাফি। লাদাখ, থাইল্যান্ড, মুম্বইয়ে শ্যুটিং হয়েছে এই সিনেমার। কিন্তু বিকাশ নওলখার ক্যামেরায় তা দর্শকের কাছে তা পাকিস্তানের শহর হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। ছবিজুড়ে পুরোনো বলিউডি গানকে দুর্দান্তভাবে ব্যবহার করেছেন সংগীত পরিচালক শাশ্বত সচদেব। ছবির আরেকটি প্লাস পয়েন্ট অভিনয়। প্রতিটি চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে সময় দিয়েছেন পরিচালক। মাজহারির চরিত্রে রণবীর সিং রক্তমাংসের স্পাই। সংলাপ কম থাকায় অভিব্যক্তি দিয়ে রাগ, কষ্টকে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তবে রণবীরকেও যেন ছাপিয়ে গিয়েছেন অক্ষয় খান্না। রহমান ডাকাইতের চরিত্রে তাঁকে ছাড়া কাউকে ভাবা যেন অসম্ভব। পাক রাজনীতিকের চরিত্রে রাকেশ বেদি ও আইএসআইয়ের মেজর ইকবালের ভূমিকায় অর্জুন রামপালও যথাযথ। অর্জুনের চরিত্রকে সম্ভবত পরের পর্বের জন্য কিছুটা লুকিয়ে রেখেছেন পরিচালক। অজয় সান্যালের ভূমিকায় মাধবন বেশিক্ষণ স্ক্রিন প্রেজেন্স না পেলেও, তিনি যে কত বড় অভিনেতা তা অল্প সময়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তুলনায় কিছুটা দুর্বল সঞ্জয় দত্ত। এসপি আসলামের চরিত্রে নিজের ম্যানারিজম থেকে বেরোতে পারেননি তিনি। পুরো সিনেমার যা মেজাজ, তাতে রণবীর ও সারা অর্জুনের রোমান্সও কিছুটা বেমানান। আর যাঁরা ‘স্লো-বার্ন’ থ্রিলার পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্য এই সিনেমা অতিরিক্ত দীর্ঘ মনে হতে পারে। কিন্তু মাজহারি আসলে কে? আপাতত মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা, দ্বিতীয় পর্বের জন্য।
শুভজিত্ অধিকারী