Bartaman Logo
৫ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ইতিহাস সৃষ্টি করেও সীতাভোগ, মিহিদানার সাম্রাজ্যে নেই ভৈরব

স্বামীজি বলতেন, ‘জন্মেছিস যখন দাগ রেখে যা।’ সবাই অবশ্য দাগ রাখতে পারেন না। তবে, কেউ কেউ পারেন

ইতিহাস সৃষ্টি করেও সীতাভোগ, মিহিদানার সাম্রাজ্যে নেই ভৈরব
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী, বর্ধমান: স্বামীজি বলতেন, ‘জন্মেছিস যখন দাগ রেখে যা।’ সবাই অবশ্য দাগ রাখতে পারেন না। তবে, কেউ কেউ পারেন। সেই সফলদের একজন বর্ধমানের ভৈরবচন্দ্র নাগ। অথচ আক্ষেপের বিষয়, শুধু ইতিহাসের পাতায়দাগ কেটেই সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেলেন তিনি। তাঁরউত্তরসূরিদের কেউই এখন আর সীতাভোগ, মিহিদানা তৈরি করেন না। দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় হল,মিষ্টান্নশিল্পে ভৈরববাবুর ‘অবদান বিক্রি’র সাম্রাজ্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে নাগবংশ।বর্ধমান শহরের বড়বাজারে শুধু টিকে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ‘ভৈরবচন্দ্র নাগ’ লেখা রংচটা দোতালা দোকানটি। যেটা আসলে মিষ্টির ল্যাবরেটরি। এখানেই ভূমিষ্ট হয়েছিল লর্ড কার্জনকে মিষ্টিমুখ করানোর সীতাভোগ, মিহিদানা।দোকানটি কিনেছিলেন মাত্র ১৬ আনায়। এখন সেটি অন্যের। ইতিহাসের সাক্ষী বলে নামটা আর বদল করেননি বর্তমান মালিক হিরন্ময় চট্টোপাধ্যায়। 

Advertisement

বর্ধমান আর সীতাভোগ-মিহিদানা সমার্থক। সময়টা ১৯০৪ সাল। তৎকালীন ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন আসবেন বর্ধমানের মাহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাবেরপ্রাসাদে। তাঁকে ‘মাহারাজা অধিরাজ’ উপাধি প্রদান করবেন। কার্জনকে খাওয়াতে ডাক পড়ল রাজ পরিবারের হালুইকর ভৈরবচন্দ্রের। তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। কার্জন ভৈরববাবুর সীতাভোগ ও মিহিদানা মুখে দিয়েই উচ্ছ্বসিত। প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন রাজ-ময়রাকে। দিলেন একটি শংসাপত্রও। সেটাই এখন সম্বল-সম্পদবর্তমান নাগ পরিবারের সদস্যদের। সময়ের সঙ্গে কঠিন যুদ্ধ চালিয়ে ভৈরববাবুর সৃষ্টি-মাহাত্ম্য বেঁচে থাকলেও বর্ধমানের মিষ্টি-বাজারে আর মেলে না তাঁদের তৈরি সীতাভোগ, মিহিদানা!  
ভৈরববাবু মারা যান ১৯৭২ সালে। তাঁর চার ছেলে—বিশ্বনাথ, নগেন্দ্র, শৈলেন্দ্র ও কালীপদ। বড় ছেলে ও ছোট ছেলে বাবার মিষ্টি ব্যবসার ধারে কাছেও যাননি। ভৈরববাবু বড়বাজারের ওই দোকান ছাড়া আর একটি মিষ্টির দোকান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটি তেঁতুলতলা এলাকায়—‘উদয়ন মিষ্টান্ন ভান্ডার’।তাঁর মৃত্যুর পর আদি দোকানটি পান নগেন্দ্র। পরে দ্বিতীয় দোকানটির মালিক হন শৈলেন্দ্র। নগেন্দ্রবাবু মারা গেলে দুই ছেলে যথাক্রমে নিমাই নাগ ও অপূর্ব নাগ আদি দোকানটি দেখাশোনা করতেন। পরে নিমাইবাবু দোকানের মালিক হন। মিষ্টি ব্যবসার হাল ধরেন তাঁর পুত্র সিদ্ধার্থশঙ্কর নাগ। ২০০০ সালে নিমাইবাবু দোকানটি বিক্রি করে দেনহিরন্ময়বাবুকে। জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় দাদুর সৃষ্টি-ঐতিহ্য বজায় রেখেঅপূর্ববাবু চলে আসেন আধ্যাত্মিক জগতে। এখন তাঁর বেশিরভাগ সময় কাটে দক্ষিণেশ্বরের রাধাকৃষ্ণ মঠে। এদিকে, শৈলেন্দ্র নাগের চার ছেলে। দুই ছেলে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। একজন প্র্যাকটিস করতেন। অন্যজন, জেলা বিচারক হয়েছিলেন। বড়ছেলে গৌরচন্দ্র ও সেজো ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই আঁকড়ে ছিলেন ভৈরবচন্দ্রেরমিষ্টান্ন ব্যবসা। পরে অসুস্থতার কারণে ‘উদয়ন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ বন্ধ করে দেন কৃষ্ণচন্দ্ররা। প্রায় ১২ বছর হয়ে গেল দোকানটি বন্ধ। অর্থাৎ, এখানেই শেষ হয়ে যায় ভৈরবচন্দ্র নাগের বংশধরদের হাতে সীতাভোগ, মিহিদানা তৈরির ধারাবাহিকতা। 
কিন্তু কেন? অপূর্ববাবু আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন, ‘সীতাভোগ, মিহিদানা তৈরি থেকে আমাদের সরে আসার পিছনে কারণ মূলত তিনটি। এক, বর্তমান সময়ে গুণমান বজায় রাখার ভয়! উৎকৃষ্টমানের ছানা আর পাওয়া যায় না। দুই, বিশ্বস্ত কারিগরের অভাব। আমরা কারিগর হয়েছিলাম। আমাদের ছেলেরা কারিগর হতে চাননি। তিন, পরিশ্রম বিমুখতা। মিষ্টি তৈরিতে বিস্তর ঝামেলা। রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা এই হাড়মাখা খাটুনি করতে পারবে না।’ তবে, বর্ধমানের বাজারে যে সকল ব্যবসায়ীরা সীতাভোগ, মিহিদানার জিআই ছিনিয়ে এনে ভৈরবচন্দ্র নাগকে মিষ্টান্ন শিল্পে অক্ষয় অমর করেছেন, তাঁদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ অপূর্ববাবু ও মিতা নাগরা।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ