Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

মিথ ভেঙে ঠাকুর দেখতে বের হন অসুররা

দুর্গাপুজো এলেই ডুয়ার্সের অসুর সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে একটি মিথের চর্চা শুনতে হয়। সেই চর্চা হল পুজোর ক’টা দিন অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা দুর্গা মায়ের মুখ দর্শন করে না।

মিথ ভেঙে ঠাকুর দেখতে বের হন অসুররা
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রবীন রায় , আলিপুরদুয়ার: দুর্গাপুজো এলেই ডুয়ার্সের অসুর সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে একটি মিথের চর্চা শুনতে হয়। সেই চর্চা হল পুজোর ক’টা দিন অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা দুর্গা মায়ের মুখ দর্শন করে না। পুজোর ক’দিন এই সম্প্রদায়ের মানুষ বাড়িতে বসেই কাটায়। 

Advertisement

অসুর সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে কী সেই মিথ? জনশ্রুতি এই যে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা নাকি মহিষাসুরের বংশধর ছিল। আর সেই মহিষাসুরকে বধ করে মা দুর্গা। সেই কারণেই অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা নাকি দুর্গা মায়ের মুখ দর্শন করে না। তাঁরা নাকি পুজোর ক’টা দিন বাড়ি থেকে বের হন না। 
কিন্তু ঐতিহাসিক ও নৃতাত্বিকগতভাবে অসুর সম্প্রদায়কে নিয়ে দুর্গাপুজোর সময় এই চর্চা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ গবেষক, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্বিকদের মতে, অসুর পদবীর মানুষকে নিয়ে এই মিথের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কারণ অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরাও দুর্গাপুজোয় যোগ দেয়। পুজোর নতুন জামাকাপড় পরে অসুর সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখে। 
গবেষকদের মতে, আসলে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে এই মিথের জন্ম হয়েছিল আর্য-অনার্যদের দ্বন্দ্ব থেকে। অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা ছিল অনার্য গোষ্ঠীর। জেলার লোকসংস্কৃতি গবেষক বঙ্গরত্ন পুরস্কার প্রাপ্ত প্রমোদ নাথ বলেন, নাক উঁচু আর্যরা অন্য সম্প্রদায়ের উপর প্রভূত্ব কায়েম করত। যাঁরা সেই প্রভূত্ব স্বীকার করত না আর্যরা তাঁদের গায়ের উপর অপমানজনক নানা তকমা লাগিয়ে দিত। 
অনার্যরা আর্যদের বশ্যতা বা প্রভূত্ব স্বীকার করেনি। সেই জন্য আর্যরা অনার্য অসুর সম্প্রদায়ের মানুষের গায়ে কখনও মহিষাসুরের বংশধর, কখনও রাক্ষস বা কখনও জংলি বলে অপমানজনক তকমা দাগিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে ভ্রান্ত মিথ তৈরি হয়েছিল যে পুজোর সময় অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা দেবী দুর্গার মুখ দেখে না। কারণ দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিল। সেই মিথ আজও বয়ে চলতে হচ্ছে ডুয়ার্সের এই অসুর পদবী মানুষদের। 
গবেষক প্রমোদবাবু বলেন, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদরো সভ্যতার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবেই যোগাযোগ ছিল অনার্যদের। সেই সময় সুঠাম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী অসুর সম্প্রদায়ের মানুষদের পেশা ছিল লোহা গলানো। অসুর সম্প্রদায়ের মানুষদের গায়ে আসুরিক শক্তি ছিল। মহেঞ্জোদরো হরপ্পা সভ্যতায় লোহার অস্তিত্ব ছিল। তাই দুর্গাপুজোর সঙ্গে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে এই ভ্রান্ত মিথের কোনও ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। 
অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণত বনবস্তি ও চা বাগান অঞ্চলেই বসবাস করতে ভালোবাসে। তাঁরা জঙ্গল সুরক্ষার কাজকেও ভালোবাসে। সরকারি নথি অনুসারে রাজ্য ৪০টি জনগোষ্ঠী আছে। এর মধ্যে অসম-বাংলা সীমানায় রাজ্যের প্রান্তিক জেলা আলিপুরদুয়ারে প্রায় ৩৬টি জনগোষ্ঠীর বসবাস। 
ডুয়ার্সে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষদের সবচেয়ে বেশি বসবাস আলিপুরদুয়ার জেলাতেই। এই জেলার গরমবস্তি, কালকূট, পোড়োবস্তি, দমনপুর, বসটারী ও শালবাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা। জলপাইগুড়ি জেলার ক্যারন চা বাগান ও কোচবিহারের জামালদহের ইন্দ্রেরকুঠিতেও অসুর সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ বসবাস করে। 
অসুর সম্প্রদায়ের পূর্ব পুরুষরা এই মিথ মানলেও বর্তমান প্রজন্ম মানে না। অসুরদের বর্তমান প্রজন্ম দুর্গাজোয় শামিল হয়। নতুন জামাকাপড় পরে মণ্ডপে মণ্ডপে দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ