নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: সালটা ১৯৭১। বাঙালি বিজ্ঞানী পীযুষকান্তি মজুমদার তখন দিল্লির ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচার রিসার্চ সেন্টারে কর্মরত। সেখানই দশেরি এবং নিলম জাতের দু’টি আমের সংকরায়নের মাধ্যমে এক নতুন আমের জাত উদ্ভাবন করেন তিনি। যার নাম দেওয়া হয় আম্রপালি।তার ট্রায়ালের জন্য বেছেনেওয়াহয়েছিলনদীয়াজেলাকে।তৎকালীন সময়ে নদীয়া জেলার চাকদহ ও কৃষ্ণনগরে এই উদ্ভিদের চারা প্রথমবার রোপণ করা হয়েছিল। ফলন হয় আশাপ্রদ। আম্রপালি আমের সেই পথ চলা শুরু।
তবে নদীয়া জেলাতে পাকাপাকি ভাবে এই আমের চাষ শুরু হতে আরও তিন দশক সময় লেগেছিল। একুশ শতকের শুরুর দিকে নদীয়ার আম্রপালি আমের কদর বাড়তে থাকে। চাষিরাও ধীরে ধীরে ঝোঁকেন আম্রপালি আম চাষে। নদীয়া জেলায় সেই আমের চাষের জমি বাড়তে বাড়তে এখন ১০০০ হেক্টরে এসে পৌঁছেছে। উদ্যানপালন বিভাগ সূত্রে জানা যাচ্ছে, নদীয়া জেলার ছ’ভাগের একভাগ জমিতেই আম্রপালি আমের চাষ হয়।
নদীয়া জেলার উদ্যানপালন বিভাগের আধিকারিক হৃষিকেশ খাড়া বলেন, বিগত ২৫ বছর ধরে নদীয়া জেলায় আম্রপালি আমের চাষ হচ্ছে। চাষিদের মধ্যেও উৎসাহ রয়েছে এই আম্রপালি আম নিয়ে। জানা গিয়েছে, প্রতি হেক্টরে আম্রপালির গড় ফলন প্রায় ১৫ টন। যার ফলে এ বছর নদীয়া জেলাতে প্রায় ১৫ হাজার টন আম্রপালি উৎপাদন হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আম্রপালি আম গাছে ধরে অন্যান্য আমের তুলনায় বেশ কিছুটা দেরিতে। যার ফলে এই আম বাজারে পাওয়া যায় অন্য সব আমের পর। শেষ মুহূর্তে বাজারে চাহিদা থাকায় চাষিরা অতিরিক্ত লাভবান হতে পারেন।
স্বাদ ও পুষ্টিগুণের দিক থেকেও আম্রপালি অনন্য। এই আমের মিষ্টতা অন্যসব আমের থেকে বেশি। আম্রপালি আঁশবিহীন, ফলে এর টেক্সচার মসৃণ ও মুখরোচক। রংও আকর্ষণীয়, গাঢ় কমলা থেকে লালচে। এই আম পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। অন্যান্য বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় আম্রপালিতে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন থাকে। আম্রপালি আমের নামকরণের পেছনে রয়েছে প্রাচীন ভারতের এক অসাধারণ সুন্দরী ও গুণবতী নারীর স্মৃতি। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বর্তমান বিহার রাজ্যের অন্তর্গত বৈশালী নগরে এক আমবাগানে জন্ম নিয়েছিল এক কন্যাশিশু। নগরের উদ্যানপালক সেই শিশুকে লালন-পালন করেন। আমবাগানে জন্ম এবং উদ্যানপালকের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠার কারণে তার নাম রাখা হয় ‘আম্রপালি’। আম্রপালি ছিলেন অপূর্ব রূপবতী। তবে রূপের পাশাপাশি তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ শিল্পগুণ। তিনি গান গাইতে পারতেন, নাচে পারদর্শী ছিলেন, বীণার সুরে মুগ্ধ করতেন, এমনকী পালি ভাষায় কবিতাও লিখতেন। বৈশালীর সভানর্তকী হিসেবে তিনি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। এই অনন্য নারীর নামেই নামকরণ করা হয়েছিল আধুনিক ভারতের নতুন প্রজাতির আমের।