Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ভূপৃষ্ঠের গভীরে

কৃতির পরতে পরতে বিস্ময়। আর তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রকৃতির এই রহস্য সন্ধানে মানুষ কখনও পাড়ি দিয়েছে মহাকাশে।

ভূপৃষ্ঠের গভীরে
  • ২০ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

স্বরূপ কুলভী: কৃতির পরতে পরতে বিস্ময়। আর তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রকৃতির এই রহস্য সন্ধানে মানুষ কখনও পাড়ি দিয়েছে মহাকাশে। আবার কখনও ডুব দিয়েছে মহাসমুদ্রের অতলে। চাঁদেও পৌঁছে গিয়েছে মানুষ। এমনকী, প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি কিলোমিটার দূরের মঙ্গলগ্রহেও নেমেছে মানুষের পাঠানো মহাকাশযান। বিজ্ঞানের হাত ধরে নানা অজানা তথ্য জানা গিয়েছে। আবার এমন অনেক রহস্য রয়েছে, যা এখনও ভেদ করতে পারেনি বিজ্ঞান। এগুলির মধ্যে অন্যতম হল পৃথিবীর অন্দরের কথা। অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেনি মানুষ! তবে বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। গবেষণা ও খনন কাজ চলছে। তারপরও পৃথিবীর অন্দরের রহস্য ভেদ করে অপরপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে পৃথিবীর কেন্দ্র এখনও মানুষের কাছে অধরা। আমরা যেখানে চলাফেরা করি, তা হল পৃথিবী পৃষ্ঠ। সেখানে রয়েছে মাটি, গাছপালা, জল, প্রাণী ইত্যাদি। পৃথিবীর এই উপরিভাগ বা ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৬ হাজার ৩৭০ কিলোমিটার। এর মাত্র ০.১ শতাংশ গভীরেও মানুষ বা কোনও যন্ত্র পৌঁছতে পারেনি। পৃথিবীর গভীরে পৌঁছতে চায় কেন মানুষ? এর দু’টি কারণ। প্রথমত, মাটির নীচ থেকে খনিজ সম্পদ সংগ্রহ। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে গভীরতম খনি রয়েছে কোথায়? দক্ষিণ আফ্রিকার এমপোনেং। এখানকার সোনার খনি মাটির নীচে প্রায় ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর। ভবিষ্যতে গভীরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্থান যেখানে মানুষ পৌঁছতে পারে। দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য মানুষ মাটির গভীরে যেতে চায়। গভীর থেকে পাথর সংগ্রহ করে আনা এবং তা বিশ্লেষণ করে মাটির নীচের চাপ ও তাপমাত্রা নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে অবশ্য মানুষ সরাসরি নামে না। যন্ত্র পাঠিয়ে পাথর তুলে আনা হয়। এ ধরনের গর্তকে বিজ্ঞানে বলে বোরহোল। পৃথিবার গভীরতম বোরহোল রয়েছে রাশিয়ার পেচাংস্কিতে। এর নাম কোলা সুপারডিপ বোরহোল। গভীরতা ১২ কিলোমিটার। 

Advertisement

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন অনেকটা পেঁয়াজের খোসার মতো বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত। ভূত্বক, ম্যান্টল বা গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল। ভূত্বক ৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপর ২ হাজার ৮৯০ কিলোমিটার ম্যান্টল। বাকিটুকু কেন্দ্রমণ্ডল। আগেই বলেছি, ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৬ হাজার ৩৭০ কিলোমিটার। গত প্রায় ৫০ বছর ধরে পৃথিবীর গভীরে পৌঁছনোর চেষ্টা হচ্ছে।  কিন্তু সেই কাজ অত্যন্ত কঠিন। 
আমরা সবাই জানি, প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর খাদ। এর গভীরতম জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার (১১,০৩৪ মিটার বা ৩৬,২০১ ফুট) গভীরে।  এর থেকেও গভীরে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪০ হাজার ২৩০ ফুট বা ১২ কিলোমিটার নীচে একটি গর্ত খুঁড়েছেন। আর সেটাই পৃথিবীর সব থেকে দীর্ঘতম গর্ত। রাশিয়ায় এই গর্তটিরই নাম কোলা সুপার ডিপ বোরহোল। তা তৈরি করতে প্রায় ছাব্বিশ বছর সময় লেগেছিল। কিন্তু এর বেশি আর এগনো যায়নি। কারণ, ১২ কিলোমিটার খোঁড়ার পরে নীচের তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, এর পরেও মাটি খোঁড়া হলে যন্ত্রপাতি গলে যাবে। সেই জন্যই ১৯৯২ সালে এই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই গর্তটিকে বলা হয় ডিপেস্ট আর্টিফিসিয়াল পয়েন্ট অন আর্থ। 
কিন্তু এত গভীর গর্ত খুঁড়ে নতুন কিছু কি জানতে পারলেন বিজ্ঞানীরা? হ্যাঁ, অনেক কিছুই জানা গিয়েছে। এখানে ৬.৯ কিলোমিটার গভীরে এককোষী ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গিয়েছে। আর সেই সঙ্গে জল। প্রশ্ন করাই যেতে পারে, মাটির নীচে জল থাকবে, এতে আশ্চর্যের কী আছে? আসলে মাটির এত গভীরে স্তর এতটাই ঘন যে সেখানে জল থাকাটা আশ্চর্যের বইকি! আর এই গভীরতায় ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। কারণ, এত বিপুল তাপ ও চাপে কোনও জীব বেঁচে থাকতে পারে বলে এর আগে ধারণা ছিল না। সেইসঙ্গে বোরহোল খননের সময় ভূগর্ভে মিলেছে প্রচুর পরিমাণ হাইড্রোজেন গ্যাসও। এই বোরহোলের একেবারে নীচে তাপমাত্রা ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। বিজ্ঞানীরা যে ধারণা করেছিলেন, তার প্রায় দ্বিগুণ। এর সর্বোচ্চ গভীরতায় পাথর রয়েছে তরল অবস্থায়, মানে 
অনেকটা প্ল্যাস্টিকের মতো। সেখানে গর্ত খোঁড়ার কাজ চালানো দুরূহ হয়ে পড়ে। যেসব যন্ত্রপাতি দিয়ে গর্ত খোঁড়া হচ্ছিল, প্রবল তাপে সেগুলি টিকে থাকতে পারেনি। 
কাজেই এর থেকে গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে চেষ্টা এখনও থেমে নেই। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ম্যান্টল বা গুরুমণ্ডল পর্যন্ত পৌঁছনো। অবশ্যই সশরীরে নয়, যন্ত্রপাতি কাজে লাগিয়ে সেখানে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু ম্যান্টলে কী রহস্যের খোঁজ পেতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা? বিজ্ঞানীদের অনুমান, ভূপৃষ্ঠের অন্দরে লুকিয়ে সৃষ্টি রহস্যের বিস্ময়কর সব উপাদান। আর তা থেকেই মহাবিশ্ব ও পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ মিলতে পারে।  ম্যান্টলে তাপমাত্রা শুরু হয় প্রায় ১০০০  ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৮৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে। তা শত শত কোটি বছরের কী বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে, তা কি কেউ আগেভাগে বলতে পারে?

সম্পর্কিত সংবাদ