Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

ডায়াবেটিসে হোমিওপ্যাথি

ডায়াবেটিসে হোমিওপ্যাথি
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
ডাঃ গৌতম আশ: ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ভারতে সুগার রোগীর সংখ্যা ফিবছর অতি দ্রুত হারে বাড়ছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক বছর ধরে এই মারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও পর্যন্ত এই রোগের স্থায়ীভাবে নিরাময়ের কোনও প্রতিকার নেই বা আবিষ্কৃত হয়নি। সমস্ত ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে বা বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি শুধুমাত্র একটি একক বার্তাই দেয়— ‘শুধু এটি নিয়ন্ত্রণ করুন।’
Advertisement
ডায়াবেটিস হল মানবদেহে এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে আমাদের দেহের অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন (একটি হরমোন যা শরীরে গ্লুকোজ বিপাক করে) খুব কম তৈরি করে বা তৈরি করা বন্ধ করে দেয় অথবা শরীর দ্বারা উৎপাদিত ইনসুলিন ভালোভাবে কাজ করে না। উভয় ক্ষেত্রেই, রক্তে চিনি বা গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে শুরু করে যা তাড়াতাড়ি বা পরে শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করে। নীচে একটি তালিকা দেওয়া হল যাতে রক্তে শর্করার মাত্রা রয়েছে যা ডায়াবেটিসের বিভিন্ন স্তর বা অবস্থা বুঝতে সক্ষম। ফলে এই তালিকা দেখেই বোঝা যাবে কেউ ডায়াবেটিসে ভুগছেন কি না? অথবা কারও ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না।
স্বাভাবিক
১. ফাস্টিং ব্লাড সুগার-এর স্বাভাবিক মাত্রা- ৭০-১০০ মিলিগ্রাম/প্রতি ডেসিলিটার রক্তে।
২. পোস্ট প্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগার (PPBS)-৭০-১৪০ mg/dl-স্বাভাবিক।
৩. র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার ৭০-১৪০ মিলিগ্রাম/প্রতি ডেসিলিটার রক্ত।
৪. এইচবিএ১সি ৫.৭ শতাংশ--এর নীচে।
প্রি-ডায়াবেটিক
১. ফাস্টিং ১০১-১২৬ মিলিগ্রাম/প্রতি ডেসিলিটার রক্ত।
২. পোস্ট প্রান্ডিয়াল—১৪০-২০০ মিলিগ্রাম/প্রতি ডেসিলিটার রক্ত।
৩. র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার ২০০ মিলিগ্রাম/প্রতি ডেসিলিটার রক্ত।
৪. এইচবিএ১সি—৫.৭-৬.৪ শতাংশ।
ডায়াবেটিস
১. ফাস্টিং ব্লাড সুগার প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ১২৬ মিলিগ্রামের বেশি।
২. পোস্ট প্রান্ডিয়াল— ২০০ মিলিগ্রাম/ প্রতি ডেসিলিটার।
৩. এইচবিএ১সি ৬.৫ শতাংশ বা তার বেশি।
মুশকিলের কথা
এককথায় বলা যায় সাধারণত ডায়াবেটিস কোনও প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেয় না। ফলে অনেক সময় রোগী অসুখ সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। ধীরে ধীরে শরীরের অভ্যন্তরের অঙ্গগুলির ক্ষতি হতে থাকে। শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবেই এদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ হারাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি। হচ্ছে কিডনির অসুখ, লিভার সিরোসিস। এমনকী নার্ভের রোগ। ডায়াবেটিসের জটিলতার কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে অঙ্গহানির মতো ঘটনাও ঘটছে।
ডায়াবেটিসের কয়েকটি প্রকার
• টাইপ১ ডায়াবেটিস • টাইপ ২ ডায়াবেটিস • গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস • অস্ত্রোপচার দ্বারা প্রভাবিত ডায়াবেটিস • রাসায়নিকভাবে প্রভাবিত (কেমিক্যাল ইনডিউসড) • প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সুপ্ত অটোইমিউন ডায়াবেটিস। তবে এইসব প্রকারের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ডায়াবেটিস হল টাইপ ২ ডায়াবেটিস। মোট ডায়াবেটিসের রোগীর মধ্যে এই সমস্যাতেই সর্বাধিক মানুষ আক্রান্ত হন।
কাদের ঝুঁকি বেশি
দেখা গিয়েছে যে সব ব্যক্তির পরিবারে ডায়াবেটিস হওয়ার ইতিহাস আছে, স্থূলত্বের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি, অলস জীবনযাপন করেন এমন মানুষ, সর্বক্ষণ উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ভোগেন এমন ব্যক্তির ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি।
অসুখের লক্ষণ
১. ঝাপসা দৃষ্টি, ২. মানসিক তীক্ষ্ণতা কমে যাওয়া, ৩. চরম তৃষ্ণা ও ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ৪. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, ৫. শরীরের ব্যাখ্যাতীত ওজন হ্রাস, ৬. ঘন ঘন ত্বকের সংক্রমণ, ৭. অসম্ভব ক্লান্তি, ৮. শরীরের যে কোনও ক্ষতের নিরাময় হতে বেশি সময় নেওয়া— ইত্যাদি।
ডায়াবেটিস নিয়েও সুগার ফ্রি
এখন সারা বিশ্বেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে রক্তে শর্করা বা সুগারের মাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলে ডায়বেটিসে আক্রান্ত যে কোনও রোগীই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। 
প্রশ্ন হল কীভাবে সুগার নিয়ন্ত্রণ করা যায়? এক্ষেত্রে যে কোনও ধারার চিকিৎসকই এক কথা বারংবার বলবেন। তা হল—
১. খাদ্যগ্রহণে নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ এমন শর্করাজাতীয় খাদ্য খেতে হবে যা জটিল এবং যার মধ্যে খুব অল্প পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকে।
২. খাদ্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র সেইসব খাদ্য  খাওয়া দরকার যেগুলির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুবই কম।
৩. নিয়মিত এক্সারসাইজ জরুরি। কারণ শরীরচর্চা এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইনসুলিনের প্রয়োজন ছাড়াই গ্লুকোজ পোড়ায়।
৪. স্থূলত্ব হ্রাস।
৫. ডায়াবেটিস রোগীর স্বাস্থ্য অনেকাংশে রোগটির পর্যায়ের উপর নির্ভর করে।
রোগের প্রতিষেধক
এখনও পর্যন্ত ডায়াবেটিসের কোনও প্রতিষেধক নেই বা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্থূলতার চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও কিছু ওষুধ যা ইনসুলিনের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
অবশ্যই মনে রাখবেন
হোমিওপ্যাথিতে ইনসুলিনের কোনও বিকল্প নেই। তাই টাইপ ১ ডায়াবেটিস বা জুভেনাইল ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় পূর্ণরূপে হোমিওপ্যাথির উপর নির্ভরশীল হওয়া সম্ভব নয়। তবে ডায়াবেটিসের সঙ্গে যে যে জটিলতা আছে তার চিকিৎসা অবশ্যই করা সম্ভব হোমিওপ্যাথিতে।
ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি
বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি ডায়াবেটিসে ভুগছেন। অসুখটি এমন এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি যা বিপাক ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। হোমিওপ্যাথি ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় শুধুমাত্র উপসর্গগুলির উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করে না। তার সঙ্গে একজন ব্যক্তির সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে। তাঁর শরীরে অন্তর্নিহিত ভারসাম্যহীনতার মোকাবিলা করে এবং সামগ্রিক সুস্থতার উন্নতি করে। 
হোমিওপ্যাথির লক্ষ্য শরীরের মধ্যে সামঞ্জস্য পুনরুদ্ধার করে অগ্ন্যাশয় থেকে প্রাকৃতিকভাবে ইনসুলিন ক্ষরণের মাত্রা বাড়ানো ও ইনসুলিন যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে তা সুনিশ্চিত করা। 
বহু হোমিওপ্যাথিক ওষুধ আছে, যাকে বলা হয় অর্গানোপ্যাথিক ওষুধ যা রক্তের শর্করার মাত্রা কমাতে পারে। কয়েকটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যেমন সিজেজিয়াম জামবোলেনাম, ইউরেনিয়াম নাইট্রিকাম, সেফালেন্ড্রা ইন্ডিকা, অ্যাব্রোমা অগাস্টা প্রভৃতি রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হলে ডায়াবেটিক রোগীর রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল হয়। তবে হ্যাঁ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাব্য সুবিধা আছে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট করা অপরিহার্য যে হোমিওপ্যাথি অসুখটির সম্পূর্ণ নিরাময় হওয়ার দাবি করে না। তবে কার্যকরভাবে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি ওষুধও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ একদিকে যেমন রক্তে উচ্চ শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম, তেমনই তার সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতাগুলির চিকিৎসাতেও সহায়তা প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। 
ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য জটিলতা
• অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস স্নায়ুর ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। ফলে রোগীর ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে হেলোনিয়াস ডিওইকা এবং কনিয়াম ম্যাকুল্যাটামের মতো হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলি ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত ব্যক্তির অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হতে পারে।
• বহু রোগীর মধ্যে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট লক্ষ করা যায়। সেক্ষেত্রে লাইকোপোডিয়াম ন্যাট্রাম মিউর এবং নেট্রাম সালফ প্রভৃতি ওষুধগুলি ইনসুলিন প্রতিরোধের অন্তর্নিহিত কারণগুলিকে সমাধান করে। এর ফলে শরীরে বিপাকীয় কার্যকারিতা ফিরে আসে।
• ডায়াবেটিক ফুট আলসার ক্যালেনডুলা অফিসিনালিস এবং সাইলিসিয়ার মতো ওষুধ ক্ষত নিরাময়ে, কোষের পুনর্জীবনে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
• ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে রটা গ্রেভোলেন্স এবং ফসফরাসের মতো হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলি চোখের স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির সঙ্গে সম্পর্কিত লক্ষণগুলি উপশমে ব্যবহৃত হয়। তবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার পাশাপাশি চক্ষু সংক্রান্ত যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
• স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ডায়াবেটিসের চিকিৎসার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইগনেশিয়া আমরা এবং আর্সেনিক অ্যালবামের সাহায্যে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।
• ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওজন নিয়ন্ত্রণ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা এবং গ্রাফাইটিসের মতো হোমিওপ্যাথিক ওষুধ ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ওজনের বৃদ্ধি ঘটাতে পারে এমন অন্তর্নিহিত ভারসাম্যহীনতারও সমাধান করে।
পরামর্শদাতা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথির (সল্টলেক) প্রাক্তন অধিকর্তা।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ