সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর:
সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর:
বারাকপুরে কালিয়ানিবাসের দাশগুপ্ত পরিবারের পুজোর বয়স ৫০০ বছরের বেশি। এই পুজোর সূচনা হয় বাংলাদেশের খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে। পুজো শুরু করেন নরহরি কবীন্দ্র বিশ্বাস। তাঁর প্রকৃত নাম নরহরি দাশগুপ্ত। তিনি কামাখ্যা মন্দিরে মাকে বালিকা বেশে দেখেছিলেন। মায়ের নির্দেশ মতো তন্ত্রমতে মদ, মাছ, মাংস সহযোগে সাধনা করতেন। পরে তিনি কবীন্দ্র বিশ্বাস উপাধি পান। বর্গি হানার পর সেখানে পুজো বন্ধ হয়ে গিয়ে যশোরের বড়কালিয়া গ্রামে পুজো চালু হয়। সেই পুজোর সূচনা করেছিলেন নরহরি দাশগুপ্তের প্রপৌত্র মধুসূদন দাশগুপ্ত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার পর পাকাপাকিভাবে বারাকপুরে চলে আসে দাশগুপ্ত পরিবার। বড়কালিয়া গ্রামের নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে মাখনলাল দাশগুপ্ত, অমূল্য দাশগুপ্ত, সন্তোষ দাশগুপ্ত, নরেশ দাশগুপ্তরা বারাকুপুরে তাঁদের পাড়ার নাম রাখেন কালিয়ানিবাস। বারাকপুর পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই পাড়ার আশুতোষ ভবনে আজও একই উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের পূজা হয়।
এই পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, পুজোর তিন দিন রাতে পাঁচ রকমের মাছ দিয়ে আমিষ ভোগ দেওয়া হয় মাকে। রুই, কাতলা, ইলিশ, চিংড়ি, কই—এই পাঁচ রকমের মাছ থাকে। ষষ্ঠী থেকে নবমী হয় ছাগ বলি। দশমীর দিন কচুশাক, পান্তাভাতের সঙ্গে রুই মাছের ল্যাজা দেওয়া হয়। তারপর হয় মায়ের নিরঞ্জন পর্ব। বনেদি বাড়ির এই পুজোর অন্যতম উপাচার হল মদ। পুজো হয় দেবীদত্ত কালিকাপুরাণ অর্থাৎ তন্ত্র মতে। মায়ের গায়ের রং তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ।
পরিবারের সদস্য মাখনলাল দাশগুপ্ত ১৯৬৩ সালে বারাকপুর পুরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন ভোটে। গত ৭০ বছর ধরে আশুতোষ ভবনে পুজো হচ্ছে একচালার প্রতিমায়। এবারও প্রথা মেনে জোর কদমে পুজো প্রস্তুতি চলছে বলে জানালেন পরিবারের অন্যতম কর্তা মাখনবাবুর ছেলে তাপস দাশগুপ্ত। তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশের খুলনায় শুরু হওয়া পুজো এখনও একই রীতিনীতি মেনে হয়ে আসছে। ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পারিবারিক এই পুজো চলে আসছে। তান্ত্রিক মতে পুজো হয়। তাই খিচুড়ি ভোগ হয় না। মাকে অন্নভোগে দেওয়া হয় দেওয়া হয় সাদাভাত আর পাঁচ রকমের মাছ। রাত ৯টায় মাকে ভোগ দেওয়া হয়। আমাদের পূর্বপুরুষ নরহরি কবীন্দ্র বিশ্বাস মাতৃদর্শন করেছিলেন। জন্মাষ্টমীর দিন হয় কাঠামো পুজো। এখন প্রতিমা তৈরির কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহু মানুষ আমাদের পুজো দেখতে আসেন। বারাকপুর কালিয়ানিবাস এলাকার অন্যতম আকর্ষণ বললেও অত্যুক্তি হবে না।’ তবে এখন এই পরিবারের পুজো তিন ভাগে ভাগ হয়েছে বলে স্বীকার করে নিয়েছেন তাপসবাবু।