নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শুক্রবার দুপুরে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড কলকাতা সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গ। ব্যাপক ঝড়, তুমুল বৃষ্টি, আর বজ্রপাতে বিপর্যস্ত জনজীবন। কালো মেঘের জেরে ভরদুপুরেই অন্ধকার নেমে আসে। দু্র্যোগ পর্বে গাছ-দেওয়াল চাপা পড়ে এবং বজ্রাঘাতে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন। মৃতদের পরিবারপিছু এককালীন ৪ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্যোগে যাঁরা জখম হয়েছেন, তাঁদের যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ পাবেন জখমরাও।’ মন্ত্রিসভার তরফে গোটা বিষয়টি তদারকি করছেন অগ্নিমিত্রা পাল। শুভেন্দু বলেন, ‘শহরে বড়ো বড়ো গাছ পড়ে বেশ কিছু মানুষ জখমও হয়েছেন। কলকাতার বড়ো গাছগুলি কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা দেখার জন্য পুরসভার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গড়া হচ্ছে।’
আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, কালবৈশাখীর দাপট সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ করেছে মহানগরী কলকাতা। বেলা পৌনে তিনটে নাগাদ মাত্র দু’মিনিটের মধ্যে ঘণ্টায় ৮৮ কিমি বেগে ঝড় বয়ে যায় দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরের উপর দিয়ে। তার কিছুক্ষণ আগে বেলা আড়াইটে নাগাদ দমদমের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭৪ কিমি। ঘূর্ণাবর্ত ও নিম্নচাপ অক্ষরেখার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে বেশি মাত্রায় জলীয় বাষ্প প্রবেশ করে শক্তিশালী বজ্রগর্ভ মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল। তার জেরেই কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে জোরালো মাত্রার ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। আজ শনিবার, দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও, কোথাও কমলা সতর্কতা জারি করা হয়নি। এদিনের ঝড়ে ওভারহেডে গাছ পড়ে বিঘ্নিত হয় শিয়ালদহ-বনগাঁ এবং হাওড়া-কাটোয়া শাখার ট্রেন চলাচল। শহরের মোট ৪০টি জায়গায় গাছ পড়েছে। অনেক জায়গায় সিগন্যাল পোস্ট এবং বিদ্যুৎবাহী খুঁটিও ভেঙে পড়ে। সল্টলেক সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় চলন্ত চারচাকা এবং দু’চাকার উপর গাছ ভেঙে কয়েকজন জখম হয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে কলকাতা বিমানবন্দরের পরিষেবা ব্যাহত হয়। এক ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয় বিমান চলাচল। প্রবল ঝড়ে কলকাতায় নামতে না পারা পাঁচটি বিমানকে অন্যত্র অবতরণ করানো হয়। কলকাতায় আসা ও কলকাতা থেকে যাওয়া মিলিয়ে মোট ২০টি বিমান দেরিতে চলাচল করেছে।
এদিনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শহরের বাজে কদমতলা ঘাটের কাছে আম কুড়োতে গিয়ে গাছে চাপা পড়ে এবং চক্ররেলের ওভারহেডের ছেঁড়া তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। রেল পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ব্যক্তির নাম গিরি (৪০)। ঝড়ের মধ্যে আম কুড়োতে গেলে গাছ উপড়ে তাঁর উপর পড়ে। তখনই ওভারহেডের তারও ছিঁড়ে যায়। পাশাপাশি চেতলার পীতাম্বর ঘটক লেনে পরিত্যক্ত একটি বাড়ির অংশ ভেঙে চাপা পড়েন প্রবীণ কুমার ঠাকুর (৩৬) নামে এক যুবক। এসএসকেএমে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। কালবৈশাখী পর্বে পুরুলিয়ার বরাবাজার ও সাঁতুড়িতে বজ্রাঘাতে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড়ে আগরবাঁধ জঙ্গলে পিকনিক করার সময় বাজ পড়ে মৃত্যু হয়েছে নবম শ্রেণির দুই পড়ুয়ার। ঝাড়গ্রামের লালগড়ের গোয়ালডাঙা গ্রামে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছে এক বৃদ্ধের। ঝড়ের সময় নৈহাটিতে হুগলি নদীতে এক মৎস্যজীবী নৌকো ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন। চুঁচুড়ার ভূপতিনগরের বাসিন্দা ওই মৎস্যজীবীর নাম অমিত মণ্ডল (৩৬)।