ব্রতীন দাস, মালদহ: রবিবার সকাল ন’টা। কালো গ্রিলের বিশাল গেট খুলে দিলেন কেয়ারটেকার। ঢুকতেই সামনে নীচতলার বারান্দায় বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা। পিছনে দেওয়ালে টাঙানো তিনজনের ছবি। এ বি এ গনি খান চৌধুরী, আবু হাসেম খান চৌধুরী (ডালু ) ও রুবি নূর। ছুটির দিনের সকালে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দু-একজন করে কংগ্রেস কর্মী আসতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হল, গনি ও ডালুহীন কোতোয়ালিতে ভিড়টা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। মূল দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের ঘরের সামনে একদল অপেক্ষায়। অন্যরা ডানদিকে। একদলের ‘ভরসা’ প্রয়াত ডালুবাবুর পুত্র তথা দক্ষিণ মালদহের সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী। অন্যদের, প্ৰিয় নেত্রী মৌসম বেনজির নূর। সকাল দশটায় দরজা খুলে দেখা দিলেন মৌসম। কর্মীদের ডেকে নিলেন ঘরে। এরই মধ্যে ঈশার ঘরের সামনে যাঁরা অপেক্ষা করছিলেন, তাঁরা জানতে পারলেন, এদিন আর এমপির সঙ্গে দেখা হবে না। তিনি ভূতনিতে বন্যা পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছেন। ফিরতে বিকেল হবে। সাংসদের পাশাপাশি ঈশা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি। ফলে সংগঠনকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, মৌসমের ‘পাখির চোখ’ ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর মালদহ আসন। সেই লক্ষ্যেই ঘুঁটি সাজাচ্ছেন তিনি। চলছে ভোটের অংক কষার কাজ।
কিন্তু কোতোয়ালি পরিবার কি আজও গনি মিথ ধরে রাখতে পেরেছে? একসময় মালদহের রাজনীতির দিক নির্দেশ হতো যে বাড়ি থেকে, এখনও সেই কোতোয়ালি পরিবারের রাজনৈতিক কৌলিন্য কি অক্ষুন্ন? নাকি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা অনেকটাই ফিকে? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। ইংলিশবাজারের বিজেপি বিধায়ক তথা বিধানসভার মুখ্য সচেতক অম্লান ভাদুড়ির খোঁচা, মালদহের রাজনীতিতে যে আর গনি মিথ কাজ করছে না, তা বেশ কয়েকটি নির্বাচনে প্রমাণিত। তাছাড়া কোতোয়ালি পরিবারের রাজনৈতিক কৌলিন্যও অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। মৌসমের তৃণমূলে যাওয়া, আবার কংগ্রেসে ফিরে আসা, এসবের কারণে মালদহের মানুষ আর ওঁদের বিশ্বাস করছেন না। কোতোয়ালি থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই থাকেন অপূর্ব চৌধুরী। বললেন, আগে সকাল হলেই জন দরবার বসে যেত কোতোয়ালিতে। উপচে পড়ত ভিড়। এখন চোখে পড়ে না। ভোটের সময় কিছু ব্যস্ততা বাড়ে। ভোট ফুরলেই আবার ঝিমিয়ে পড়ে কোতোয়ালি। গনিখানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন ৭৬ বছরের পরিতোষ সিং। বর্তমানে কংগ্রেসের রতুয়া-১ নম্বর ব্লকের সভাপতি। মৌসমের ডাকে এদিন এসেছিলেন কোতোয়ালিতে। বললেন, বরকত সাহেবের চিরকুটে আমার চাকরি হয় বিদ্যুৎ দপ্তরে। তাঁর আমলে কোতোয়ালির যে গরিমা ছিল, আজ হয়তো সেটা নেই। তবে ঈশা চেষ্টা করছেন। মৌসম কংগ্রেসে ফেরার পর উত্তর মালদহে নতুন করে জনসংযোগ করছেন। তবে আরও বেশি সময় দিতে হবে তাঁকে। পরিতোষবাবুর দাবি, গনি মিথ ফিকে হয়নি। জোর করে ফিকে করার চেষ্টা চলছে। যাতে কংগ্রেসের ফল খারাপ হয়। মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। ফল বেরনোর পর প্রচার করা হচ্ছে, গনি আবেগ কাজ করছে না। কিন্তু মালদহের রাজনীতি থেকে গনি মিথ মোটেই মুছে যায়নি।মালদহের রাজনীতিতে কি আজও গনি মিথ অটুট? মৌসমের বক্তব্য, গনি খান চৌধুরীর সময়ের সঙ্গে এখনকার তুলনা করলে চলবে না। তবে কোতোয়ালি পরিবারের রাজনৈতিক কৌলিন্য আজও বর্তমান। মাঝে তৃণমূলের সময়ে অনেকে ওদিকে ঝুঁকেছিলেন। ভেবেছিলেন, তৃণমূল হয়তো অনেক কিছু করবে। কিন্তু এখন মানুষ বুঝতে পারছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে একমাত্র কংগ্রেসই ভরসা। ফলে মানুষ ফিরছেন। কোতোয়ালিতে আবার ভিড় বাড়বে।
ঈশার বক্তব্য, আমাকে সাংসদ ও দলের জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়। মালদহে থাকলে কোতোয়ালিতে মানুষজনের সঙ্গে কথা বলি। মৌসমও কোতোয়ালিতে থাকলে মিটিং করে। গনি সাহেব যে ঘরে বসতেন, সেটিকে মিউজিয়াম করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সবার সঙ্গে এনিয়ে কথা চলছে। ছবি: মলিন দাস।