নয়াদিল্লি: গত বছরের এপ্রিল মাস। লোকসভা ভোটের প্রচার তখন মধ্যগগনে। রাজস্থানের বাঁশওয়াড়ায় নির্বাচনী ভাষণ দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হঠাৎই বলে বসলেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মা-বোনেদের গয়না অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হবে। মঙ্গলসূত্রটাও ছাড়া হবে না।’ অভিযোগ ওঠে, ভোটে জিততে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তাতেও অবশ্য মোদিকে থামানো যায়নি। একের পর এক প্রচার সভায় বিদ্বেষ ভাষণ দিয়ে গিয়েছেন। শেষপর্যন্ত নির্বাচনে জিতে তৃতীয়বারের জন্য বসেছেন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। আর তারপরই চরমে উঠেছে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার। তাদের সঙ্গে হওয়া অপরাধের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তৃতীয় মোদি সরকারের গত এক বছরের পরিসংখ্যান অন্তত সেই কথাই বলছে। সবথেকে বেশি অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে বিজেপি শাসিত আরও দুই রাজ্য মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ। শুধু মুসলিম নয়, রেহাই পায়নি দলিত, আদিবাসী, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও।
২০২৪ সালের ৭ জুন থেকে চলতি বছরের ৭ জুন পর্যন্ত সারা দেশে এমন বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) নামে একটি সংস্থা। ‘হেট ক্রাইম রিপোর্ট: ম্যাপিং ফার্স্ট ইয়ার অব মোদি’জ থার্ড গভর্নমেন্ট’ নামে ওই রিপোর্ট বলছে, মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত এক বছরে এমন ৯৪৭টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪৫টি বিদ্বেষ ভাষণ। বাকি ক্ষেত্রে সরাসরি অত্যাচারের শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। প্রাণ গিয়েছে ২৫ জনের। তাঁদের প্রত্যেকেই মুসলিম।
যে সব বিদ্বেষ ভাষণের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলির মধ্যে ১৭৮টি ক্ষেত্রে বিজেপির কোনও না কোনও নেতার নাম জড়িয়ে রয়েছে। পাঁচটি অভিযোগ রয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নামে। তালিকায় আছেন দুই বিচারপতি ও এক রাজ্যপালও। পিছিয়ে নেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীরাও। অন্তত ৬৩ বার তাঁরা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো সরাসরি ঘোষণা করেছেন, ‘আমি মুসলিমদের বিপক্ষেই থাকব।’ ৭১টি ঘটনায় অভিযুক্ত বিজেপির টিকিটে জয়ী জনপ্রতিনিধিরা।
রিপোর্ট বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। শুধু অক্টোবরেই ৮০টি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ওই সময়েই কেন? কারণ, সারা দেশে উত্সবের মরশুম। গত সেপ্টেম্বরে গণেশ চতুর্থীর সময় মধ্যপ্রদেশের পান্নায় মুসলিমদের বাড়ি ভাঙচুর করেছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। মহারাষ্ট্রের থানেতেও একই ঘটনা ঘটে। উত্তরপ্রদেশের বাঘপতে হোলির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে না চাওয়ায় এক মুসলিম ব্যক্তির উপর হামলা চালানো হয়।
গত এক বছরে ৬০২টি অপরাধের ক্ষেত্রে এফআইআর দায়ের হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ। তবে ব্যবস্থা নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে পুলিস।