নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়া শ্রমিকের আর্তনাদ— ‘হাত, পা কাটা পড়ুক। প্রাণটা বাঁচাও।’ এভাবেই জীবন ভিক্ষা চাইছেন আটকে পড়া শ্রমিকরা। ওই আর্তনাদ শুনে ক্ষণিকের জন্য যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন উদ্ধারকারীরা। শেষমেশ মানসিক দৃঢ়তাকে সঙ্গী করেই আটকে পড়া শ্রমিকদের প্রাণরক্ষায় জীবন বাজি রাখলেন তাঁরা। এই উদ্ধারকাজে প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেন বন্দর ও তারাতলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে চলে আসে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পুরসভা, দমকল, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগ, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনডিআরএফ), সেন্ট্রাল ফোর্স। সবশেষে আসে সেনাবাহিনী। তাঁদের দক্ষ হাতে গতি পায় উদ্ধারকাজ। যৌথ ব্যবস্থাপনায় ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় হতাহতদের। সৌজন্যে অত্যাধুনিক লাইফ ডিটেক্টর যন্ত্র। কিন্তু, উদ্ধারকাজে সাফল্য পেলেও রয়ে গেল কিছু শ্রমিকের নিথর দেহ। রাত পর্যন্ত চলল মসৃণ উদ্ধারকাজ।
বেলা পৌঁনে ১২টা নাগাদ নির্মীয়মাণ তিনতলা গোডাউন ভেঙে পড়ে তারাতলার হাইড রোডে। বিকট শব্দ শুনে ছুটে আসেন সংশ্লিষ্ট নির্মাণের ট্রান্সপোর্ট কর্মী মনোরঞ্জন সর্দার। বলা ভালো, সবার আগে উদ্ধারকাজে হাত লাগান তিনি। নিজের চোখে দেখেন, লোহার মোটা বিমের নীচে চাপা পড়ে রয়েছেন এক শ্রমিক। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু হাতটা বাইরে। দেহে যে প্রাণ রয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে হাতের নড়াচড়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তাও বন্ধ হয়ে যায়। ততক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে থানা। সেই সূত্রে লালবাজারে। ঘটনার বিবরণ শুনেই নবান্নের তরফে এনডিআরএফ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে উদ্ধারকাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এয়ারপোর্ট সংলগ্ন কৈখালিতে এনডিআরএফের বারাক। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে তিন দফায় এক কোম্পানি কেন্দ্রীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী রওনা দেয় তারাতলার উদ্দেশ্যে। তাঁদের সঙ্গে ছিল উন্নত যন্ত্রপাতি, গ্যাস কাটার সর্বোপরি লাইফ ডিটেক্টর। যা গার্ডেনরিচে নির্মীয়মাণ বাড়ি বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই ডিটেক্টর দিয়েই ধ্বংসস্তূপের উপর হন্যে হয়ে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ালেন এনডিআরএফের দুই কর্মী। ওই যন্ত্রে সবুজ সিগন্যাল পাওয়ামাত্র বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি তাঁরা। তৎক্ষণাৎ ক্রেন, গ্যাস কাটার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রথমদিকে কাজ চলছিল কিছুটা মন্থর গতিতে। সেনাবাহিনী নামতেই বিদ্যুৎগতিতে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক স্ট্রেচারে পরপর তোলা হয় আহত শ্রমিকদের। তাঁদের পাঠানো হয় এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি ঘ্রাণশক্তিতে সমৃদ্ধ পুলিশ কুকুরও নামানো হয় উদ্ধারকাজে। কলকাতা পুলিশের ডগ স্কোয়াডের তরফে একটি স্নিফার ডগকে নিয়ে আসা হয় দুর্ঘটনাস্থলে। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বর্গমিটার জুড়ে ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়া শ্রমিকদের গন্ধ খুঁজে বেড়াল এই অবলা ইন্টেলিজেন্ট।
এদিনের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজের গতি দেখে প্রশংসা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, দ্রুতগতিতে উদ্ধারকাজ সামলাচ্ছে পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। তাঁদের সাধুবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী।