


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা। ঘটনাস্থল এনআরএস মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি সার্জারি অপারেশন থিয়েটার। কেষ্টপুরের জগৎপুরের বাসিন্দা সুমিত কর্মকারের (নাম পরিবর্তিত) চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে চিকিৎসকরা। ‘রহস্যময়ভাবে’ আস্ত ক্রিকেট বল ঢুকে রয়েছে ৫৬ বছরের সুমিতবাবুর শরীরে। মলাশয় ও বৃহদন্ত্রের মাঝখানে। বেশ বড়ো বলটি বের করার দুটি চেষ্টা বিফলে গিয়েছে। এসব কেসে দক্ষ সার্জনদের প্রিয় যন্ত্র অ্যালিস টিস্যু ফরসেপ আর স্পঞ্জ হোল্ডিং ফরসেপ। দুটি দিয়েই আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছে। কাজে দেয়নি। তৃতীয় বিকল্প সার্জনের ছুরি বা স্ক্যালপেল দিয়ে বলটিকে আড়াআড়ি কেটে ফেলা। তারপর ফরসেপ ঢুকিয়ে বের করে আনা। সেই চেষ্টাও করলেন সার্জারির অধ্যাপক ডাঃ অমিত রায়। কিন্তু প্লাস্টিকের সবুজ বলটি এতটাই শক্ত, ভেঙেই দিল স্ক্যালপেলের ব্লেড! চতুর্থ বিকল্প পেট চিরে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া সুবিধাজনক অবস্থান থেকে বলটি বের করা। তাতেও বিধি বাম! বলটি দেখা গেলেও বের করে আনতে গেলে পরে জীবনমরণ সংকট হতে পারে সুমিতবাবুর। তাহলে? সার্জনদের মাথায় খেলল স্ত্রীরোগ বিভাগের বিভিন্ন যন্ত্রের কথা। নর্মাল ডেলিভারির সময় সেগুলি দিয়েই বের করা হয় বাচ্চাকে। ডাঃ রায়ের ডাক পেয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে ওটিতে হাজির হলেন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান ডাঃ রুনা বল এবং তাঁর টিম।
প্রথমে সন্তান বের করার মেটালিক ফরসেপ প্রয়োগ হল। জায়গাটি বেশি স্থিতিস্থাপক এবং বড়ো না-হওয়ায় ঢুকতেই পারল না। কিন্তু নিরাশ করল না গর্ভস্থ সন্তানের মাথা বের করে আনার জনপ্রিয় অর্ধবৃত্তাকার যন্ত্র ভেন্টুস। ভ্যাকুয়াম নির্ভর যন্ত্রটি দিয়ে টানতেই বেরিয়ে এল বলটি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল গোটা টিমের!
তিন দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র অধ্যাপকরা অকপটে জানালেন, এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা জীবনে পড়েননি। শুক্রবার এনআরএসে ডাঃ রায় ও রুনাদেবী একযোগে বললেন, পৃথিবীর চিকিৎসাশাস্ত্রের নথিভুক্ত ইতিহাসে স্ত্রীরোগ বিভাগের ভেন্টুস দিয়ে রেকটামের ভিতর ঢুকে থাকা বলজাতীয় জিনিস বের করার ঘটনা ঘটেছে মাত্র একবার! ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল মেলবোর্ন হাসপাতালে!
লাখ টাকার প্রশ্ন হল, বলটা ঢুকল কীভাবে? এখানেই ঘনিয়েছে রহস্য! রোগীর ছেলে সুবল কর্মকারের (নাম পরিবর্তিত) দাবি, ঠিক জানি না। ঘটনাটি ১ বৈশাখের। বাবা মাটি কাটার কাজ করে। জানায়, কাজ শেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল। তারা নাকি কিছু একটা খাওয়ায়। তারপরই এসব হয়েছে। রাতে বাড়ি ফিরে পায়খানা করতে গিয়ে দেখে কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ লাগছে। প্রথমে বিধাননগর হাসপাতাল এবং সেখান থেকে এনআরএস নিয়ে যাই। অপারেশনের পর এখন ভালো আছে।
ঘটনাটি ‘রহস্যময়’ হওয়ায় হাসপাতাল পুলিসে অভিযোগ জানিয়েছে। এদিকে বলটি রেকটামে ঢোকায় সেখানকার স্পিংটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই পায়খানার রাস্তা বের করে পাউচ দিয়ে রাখা আছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আগামী ছয়মাসে অন্তত দুটি অপারেশন করতেই হবে সুমিতবাবুর। এমনই জানিয়েছেন ডাক্তাররা।