নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: হালিশহরের নিবারণ সোম। পেশায় ব্যাংককর্মী। রবিবার সকালে বাজার করছিলেন। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ সবজি দোকানে আলু-পেঁয়াজের স্তূপে মুখ থুবড়ে পড়লেন! কোথাও হোঁচট খাননি। অজাতশত্রু মানুষটিকে কেউ আচমকা ধাক্কাও মারেনি। তাঁর অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলেন আশপাশের লোকজন। একজন কাছে গিয়ে দেখলেন, শ্বাসপ্রশ্বাস একেবারেই ক্ষীণ। প্রাণপাখি যেকোনো সময় উড়ে যাবে! এমন সময় জমে যাওয়া ভিড় থেকে এগিয়ে এল ২০-২২ বছরের এক তরুণ। বলল, ‘আপনারা ভিড় খালি করুন। একজন কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।’ তারপর অদ্ভূত কায়দায় নিবারণবাবুর বুকে দুহাত দিয়ে চাপ দিতে থাকলেন। আর মাঝেমধ্যে মুখে মুখ লাগিয়ে ফুঁ দিতে থাকলেন। মিনিটখানেক যেতে না যেতেই চোখ মেললেন বছর পঞ্চান্নর নিবারণবাবু।
নাহ্, গল্প নয়! ভারতে রোজ সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে কমবেশি ২ হাজার মানুষ মারা যায়। চিকিৎসকরা বলেন, বিপদের সময়ে বিশেষভাবে বুকে চাপ দেওয়া ও মুখ দিয়ে মুখে অক্সিজেন পাঠালে মিরাকেল সম্ভব। তেমন হয়ও। এবার তাই রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও প্রাইভেট স্কুলের নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের এই কৌশলের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। জীবনদায়ী কৌশলটির নাম সিপিআর বা কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন।
বর্তমানে এই চার ক্লাস মিলিয়ে শুধু বাংলা মাধ্যমেই আছে প্রায় ২৯ লক্ষ পড়ুয়া। সিবিএসই, আইসিএসই এবং আইএসসি মেলালে সংখ্যাটা ৩২ লক্ষ ছাড়াবে। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে খবর, নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েই গিয়েছে। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে। কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের একদিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্বাস্থ্যদপ্তরের এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু বলেন, ‘অত্যন্ত জরুরি ট্রেনিং। প্রচুর মানুষের প্রাণ বাঁচতে পারে এভাবে। তবে পদ্ধতি ভুলে গেলে বা ভুলভাল প্রয়োগে হিতে বিপরীত হতে পারে।’
সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ জ্যোতির্ময় পাল বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাক, হার্টের ছন্দপতন বা হার্ট ব্লকের কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। ডুবে যাওয়া বা অন্য কোনো কারণে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ বা ক্ষীণ হলে কাজে আসতে পারে সিপিআর। ট্রমা, দুর্ঘটনা বা আকস্মিক মানসিক আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারালেও এটি কাজে লাগতে পারে।’ চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এক্ষেত্রে অসুস্থ মানুষের বুকে নির্দিষ্ট ছন্দে মিনিটে ১০০-১২০ বার চাপ দিতে ও ছাড়তে হবে। প্রতি ৩০ বার বুকে চাপ দেওয়ার পর মুখ দিয়ে ২ বার করে ফুঁ দিতে হবে অসুস্থের মুখে। এইভাবে প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত।



