


নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: হাবড়া মানেই একসময়ের লালদুর্গ। উত্তর ২৪ পরগনার এই বিধানসভা কেন্দ্রের অলিগলি, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন, ক্লাব-সংস্কৃতি—সবকিছুর সঙ্গেই যেন মিশে ছিল বাম রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া। সেই ইতিহাস এখন অনেকটাই ফিকে। তৃণমূলের উত্থান, বিজেপির আগ্রাসী বিস্তার—দুইয়ের চাপে সিপিএম বহুবছর ধরেই কোণঠাসা। কিন্তু ২০২৬-এর ভোটকে ঘিরে হাবড়ার মাটিতে ফের যেন ধীরে ধীরে শোনা যাচ্ছে পুরানো স্লোগানের প্রতিধ্বনি। ধীরে ধীরে বাম নেতা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে জমে থাকা ‘আগে রাম, পরে বাম’ এই মিথ ভাঙতে বসেছে বলেই মনে করছেন নেতৃত্ব।
এবারের লড়াইয়ের চরিত্রটাও বেশ আলাদা। তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে। বিজেপির প্রার্থী বনগাঁর দেবদাস মণ্ডল। দুজনের কেউই হাবড়ার স্থায়ী বাসিন্দা নন। এই বিষয়টিকেই রাজনৈতিক ইস্যু করে তুলতে চাইছে সিপিএম। তাদের প্রার্থী ঋজিনন্দন বিশ্বাস—হাবড়ার বাসিন্দা, স্কুলশিক্ষক। এলাকায় তিনি ‘মাস্টারমশাই’ বলেই পরিচিত। তাই ‘লোকাল বনাম বহিরাগত’ এই সরল সমীকরণকে সামনে রেখে প্রচারের ছক কষছে লাল শিবির। তবে শুধু এই ইস্যু নয়, হাবড়ার সামগ্রিক চিত্রটাকেই নতুন করে ধরতে চাইছে তারা। শহর আর গ্রাম মিশিয়ে তৈরি এই কেন্দ্রের সমস্যার তালিকাও দীর্ঘ। রাস্তাঘাট, জল নিকাশির সমস্যা, বর্ষায় জল জমে থাকা, কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে লালপার্টির প্রচারের ইস্যু।
বহুবছর ধরে এসব ছোটো ছোটো অসন্তোষ জমে আছে। বড়ো রাজনৈতিক তর্কের আড়ালে সেগুলোই অনেকসময় চাপা পড়ে যায়। এবারে সেই ‘ছোটো’ ইস্যুগুলিকেই বড়ো করে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে সিপিএম। একুশের নির্বাচনে ফলাফল ছিল স্পষ্ট। তৃণমূল প্রায় ৪৪.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে, বিজেপি ৪২.৭ শতাংশ নিয়ে ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। আর সিপিএম মাত্র ১০.৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ। সেইসময় বামেদের একাংশের মধ্যে যে ধারণা কাজ করেছিল, বিজেপি শক্তিশালী হলেই তৃণমূলকে সরিয়ে বামেদের সুযোগ তৈরি হবে। এবার সেই ভাবনার ভাঙন স্পষ্ট। বরং এখন জোর দেওয়া হচ্ছে একেবারে উলটো পথে। নিজেদের সংগঠন, শক্তি, এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা। বড়ো বড়ো মিটিংয়ের বদলে ছোটো ছোটো বৈঠক, দেওয়াল লিখন, চায়ের দোকানে আড্ডা। এই পুরানো পদ্ধতিতেই ফিরছে লাল শিবির।
হাবড়ার স্টেশন চত্বর থেকে শুরু করে আশপাশের গ্রামাঞ্চল—প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রচার চালানোই লক্ষ্য। আগে যেখানে বাম রাজনীতিতে মহিলাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল, সেখানে এবার চিত্রটা অনেকটাই বদলেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলা, সমস্যার খোঁজ নেওয়া, ছোটো ছোটো সভার আয়োজন—এই সবকিছুতেই মহিলারা এখন সামনের সারিতে। দলের অনেকেই মনে করছেন, এই পরিবর্তনই হতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’। অন্যদিকে, তৃণমূলের সংগঠন এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। পাশাপশি রয়েছে বিজেপিও। ফলে লড়াইটা ত্রিমুখী হবে বলেই দাবি সিপিএম প্রার্থী ঋজিনন্দন বিশ্বাসের। তিনি বলেন, ‘আগে রাম পরে বাম’ এই তত্ত্ব মানুষ বুঝছেন না। ‘তৃণমূল ও বিজেপির সেটিং’ মানুষ বুঝে গিয়েছেন। হাবড়ায় নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। তবে, এটুকু বলতে পারি, মানুষ এবার আমাদের দিকেই ফিরছেন।