Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সিলিকোসিস নিয়ে কোর্টের নির্দেশই সার, এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি আক্রান্ত ১৪৪ জন শ্রমিক

ফুসফুসে ঢুকে পড়েছে পাথরের গুঁড়ো। মারণব্যধি সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবন।

সিলিকোসিস নিয়ে কোর্টের নির্দেশই সার, এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি আক্রান্ত ১৪৪ জন শ্রমিক
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: ফুসফুসে ঢুকে পড়েছে পাথরের গুঁড়ো। মারণব্যধি সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে জীবন। এঁদেরই শ্রমের বিনিময়ে মহম্মদবাজারের পাথর বা খড়ি শিল্পাঞ্চলে চলছে কোটি কোটি টাকার বেআইনি কারবার। অথচ সেই শ্রমিকদের কপালে জুটছে কেবল বঞ্চনা আর যন্ত্রণা। শুধুমাত্র মহম্মদবাজার ব্লকেরই ১৪৪ জন বাসিন্দা সিলিকোসিস আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৩৩ জন ক্ষতিপূরণ পেলেও, বাকিরা এখনও সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। সোমবার জীর্ণ শরীর নিয়ে সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সিউড়িতে জেলাশাসকের দপ্তরে হাজির হলেন আক্রান্তরা। জেলাশাসককে নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা জানান তাঁরা। 

Advertisement

মহম্মদবাজার ব্লকের পাচামী ও প্যাটেল নগর এলাকায় পাথর এবং খড়ি খাদানের রমরমা। অভিযোগ, এই পাথর কারবারের ৯০ শতাংশই চলে অবৈধভাবে। অধিকাংশ পাথর খাদান ও ক্রাশার আবার সরকারি ভাবে নথিভুক্তই নয়। নেই জাতীয় পরিবেশ আদালতের ছাড়পত্র, নেই শ্রমিকদের বিমা ও সুরক্ষার জন্য বিশেষ পোশাক। এমনকী পাথরের গুঁড়ো শরীরে ঢোকা আটকাতে ন্যূনতম মাস্কও দেওয়া হয় না তাঁদের। পাথরের গুঁড়ো বাতাসে ওড়া রুখতে জল ছিটানোর ব্যবস্থাও নেই ক্রাশারগুলিতে। এই বেআইনি কারবারে একদল লোকের আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও, মিনু বেসরা, প্রশান্ত বাগদি, নিতাই বাগদি, হজ মহম্মদ বা অঙ্গুর শেখের মতো শ্রমিকরা আজ রোগে ভুগে শয্যাশায়ী। দীর্ঘদিন পাথর খাদান কিংবা ক্রাশারে কাজ করতে করতে সিলিকোসিস মারণ রোগে আক্রান্ত তাঁরা। 
প্রশাসন সূত্রে খবর, গত দেড় বছরে বেশ কিছু শনাক্তকরণ শিবিরের মাধ্যমে ১২০০ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। সাতটি মেডিকেল বোর্ড পরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ১৪৪ জনকে সিলিকোসিস আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করে। রাজ্য সরকারের নিয়ম এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সিলিকোসিস আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর প্রত্যেকের এককালীন ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। এছাড়া শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী মাসে চার হাজার টাকা পারিবারিক ভাতাও পাওয়ার কথা। কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে গেলেও ১১১ জন সিলিকোসিস আক্রান্ত আজও সেই টাকা পাননি।
এদিন সিউড়িতে এসে যন্ত্রণার কথা শোনালেন দীঘলগ্রামের ষাটোর্ধ্ব হজ মহম্মদ, অঙ্গুর শেখ। তাঁদের অভিযোগ, একাধিকবার আবেদনেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ। পাচামীর আদিবাসী মহিলা শ্রমিক মিনু বেসরার কথায়, শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়, কাজ করা বারণ। এক বছর ধরে দেবে দেবে বলছে, কিন্তু টাকা দিচ্ছে না। সংসার চালাব কী করে? একই আক্ষেপ খড়ি খাদানের শ্রমিক নিমাই বাগদিরও। ক্রমাগত কাশি আর মাথা ঘোরার সমস্যায় তিনিও এখন কর্মহীন। রামপুরের পাথর ক্রাশারের শ্রমিক রহিম মোমিন বলেন, এই ভাঙা শরীরে কোনো কাজ করতে পারি না। বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে কে? সরকার যদি ক্ষতিপূরণ না দেয়, তাহলে সংসার চলবে কী করে?
সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে মির্জা জসিমউদ্দিন বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে সিলিকোসিস আক্রান্তদের বঞ্চিত করে রেখেছে। আমরা অবিলম্বে প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া দাবি জানাচ্ছি। কেন মিলছে না এই প্রাপ্য টাকা? এই প্রশ্নে শ্রমদপ্তর মুখে কুলুপ আঁটলেও দপ্তরেরই এক আধিকারিকের তির্যক মন্তব্য, সবাই এই অবৈধ কারবার থেকে শুধু লুট করতে ব্যস্ত। শ্রমিকদের কথা আর কেউ ভাবে না। বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈন অবশ্য আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন দেখার, প্রশাসনের এই আশ্বাসে মহম্মদবাজারের জীর্ণ ফুসফুসগুলো আদৌ স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারে কি না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ