Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সার্বিক ব্যয়সংকোচের পথে দেশ

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। বেশিরভাগ দেশেরই অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। খনিজ তেল এবং গ্যাস আমদানির জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থ। যুদ্ধপরিস্থিতিতে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে মার্কিন ডলার (ইউএসডি), অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের দাম মেটাতে ইউএসডি অপরিহার্য।

সার্বিক ব্যয়সংকোচের পথে দেশ
  • ২০ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। বেশিরভাগ দেশেরই অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। খনিজ তেল এবং গ্যাস আমদানির জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল অর্থ। যুদ্ধপরিস্থিতিতে মহার্ঘ হয়ে উঠেছে মার্কিন ডলার (ইউএসডি), অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের দাম মেটাতে ইউএসডি অপরিহার্য। একদিকে বেড়েছে পেট্রপণ্যসহ বহু জিনিসের দাম, অন্যদিকে ইউএসডির প্রেক্ষিতে কমেছে দেশীয় মুদ্রার দাম। ফলে ব্যয়ভার অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। সমস্যাসংকুল দেশের তালিকায় ভারতের নাম চলে এসেছে একেবারে সামনের সারিতে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে অন্তত সাময়িক ব্যয়সংকোচ জরুরি। এজন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নানা ক্ষেত্রে ব্যয়সংকোচের উপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব পণ্য বিদেশ থেকে বহুলাংশে আমদানি করতে হয় তার ব্যবহারে রাশ টানারই পরামর্শ দিয়েছে মোদি সরকার। কেননা, আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। বলা বাহুল্য, আমদানির দাম মূলত ইউএসডিতেই মেটাতে হয়। তার ফলে বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের উপর বাড়তি চাপ পড়ে। যেমনটা হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই সংকট যদিও দ্রুত কাটিয়ে উঠেছিল দেশ। তবে রেখে গিয়েছিল একটি শিক্ষণীয় সংকেত। 

Advertisement

আপাতত ভারতের বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের সুস্বাস্থ্যই বজায় রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই মুহূর্তে (৮ মে, ২০২৬ তারিখের হিসাবে) দেশে ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভের মোট পরিমাণ ৬৯৬.৯৯ বিলিয়ন ইউএসডি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় খুব বেশি দেশের নেই, ভারত এই প্রশ্নে শীর্ষ পাঁচ রাষ্ট্রের অন্যতম। এই টাকায় আগামী ১১ মাসের আমদানি এবং ঋণ পরিশোধের সংকুলান সম্ভব। কিন্তু এত বড়ো রাষ্ট্রের প্রয়োজন তো সেখানেই থেমে যাবে না। আগামী দিনগুলির কথাও বিশেষভাবে ভেবে রাখতে হবে সরকারকেই। সেই সৎচিন্তা থেকেই ব্যয়সংকোচের আরজি ও পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সোনা থেকে তেল-গ্যাস প্রভৃতি যেসব জিনিস একান্তই আমদানিনির্ভর, মিতব্যয়িতার তালিকায় সেগুলিকেই রাখা হয়েছে সচেতনভাবে। এই পথে কেন্দ্র বা কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির হাঁটাই প্রকৃত সমাধান নয়। অনেকগুলি রাজ্য নিয়েই বিশাল ভারত। সহযোগীর ভূমিকায় নামতে হবে রাজ্যগুলিকেও। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দিতে দেরি করেনি। দিল্লির দেখানো পথেই জোরকদমে হাঁটা শুরু হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর, ব্যাংক, বিমা, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতে ব্যয়সংকোচ নির্দেশিকা জারি হয়ে গিয়েছে আগেই। সবরকম খরচ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের। 
তারই সঙ্গে সংগত করছে এবার নবান্নও। রাজ্যের সমস্ত সরকারি দপ্তরের খরচ কমানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে মুখ্যসচিবের দপ্তর। এই ব্যাপারে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভার্চুয়াল বৈঠক, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সুযোগ সৃষ্টি এবং কাগজের ব্যবহার কমাতে ‘ই-অফিস’ ব্যবহারে গুরুত্ববৃদ্ধি করতে বলেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। যাতায়াতের ক্ষেত্রে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাও যথার্থ—সরকারি কর্মীরা প্রাইভেট গাড়ির বদলে কারপুল ব্যবহার করুন, অর্থাৎ একই গাড়িতে অনেকে সওয়ার হোন। গণপরিবহণ এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহারে ঝোঁক বৃদ্ধির উপরে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্যও উপযুক্ত পদক্ষেপ করা হবে। সরকারি ক্ষেত্রে কেনাকাটায় অগ্রাধিকার পাবে দেশীয় পণ্য। ‘স্বদেশি’ উদ্যোগকে উৎসাহিত করাই বাংলার প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকারের নীতি। প্রধানমন্ত্রী সাত দফা নির্দেশিকা দিয়েছেন। বিদেশে তো বটেই, দেশের মধ্যে সফরেও রাশ টানার নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। ওই নীতি অনুসারে, আপৎকালীন প্রয়োজন ছাড়া সমস্ত বৈঠক হবে ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে। দপ্তরের যত গাড়িই থাকুক, ব্যবহার করতে হবে কেবলমাত্র ইলেকট্রিক কার; পেট্রল-ডিজেল গাড়ি আর ভাড়াও নেওয়া যাবে না। রাজ্য সরকারের তরফে এই নীতি অনুসরণ সাধুবাদযোগ্য। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ব্যয়সংকোচের এই নীতি যেন কর্মসংস্থানের উপর কোনোরকম বিরূপ প্রভাব না ফেলে। তখন অর্থনীতির স্বাস্থ্যহানি ঠেকানো মুশকিল হতে পারে। আর এই অবক্ষয় একবার শুরু হলে তা রুখে দেওয়া সহজ হবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ