দেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থার সাথে পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তাঁর পরিভ্রমণ। তাঁর এই পরিকল্পনা ছিল একান্ত অভিনব। এর আগে কোন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতা দেশের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্যে এইরকম পদক্ষেপ নেননি। তিনি দেশের দারিদ্র্য ও শোচনীয় দুর্দশা দেখেছেন। দেখেছেন ধনী ও উচ্চবর্ণের প্রচণ্ড দমননীতি। দেশের এই অবস্থা তাঁর জীবন্ত নরক সদৃশ মনে হয়েছিল। স্বামীজী নিজেকেই প্রশ্ন করলেন— আমাদের দেশে সীমাহীন দারিদ্র্যের এই বিভীষিকা কেন? আমাদের দর্শন ও জীবনযাত্রার মধ্যে নিশ্চয়ই কোথাও গলদ রয়েছে, তাই এহেন দুর্দশা। আর এই অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য আমাদের সকলকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে। এইরকম জিজ্ঞাসা ও সমাধান আমরা প্রথম এদেশে পেলাম স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে। তিনি সন্ন্যাসী। জাগতিক সব কিছু ত্যাগ করেছেন। কিন্তু দেশপ্রেম ও মানব প্রেমের জ্বলন্ত শিখায় তিনি ভাস্বর। জনগণের দুর্দশা দেখে তাঁর দু নয়ন অশ্রুপূর্ণ হয়েছিল।
কন্যাকুমারীর শিলাখণ্ডের উপর ধ্যানে বসে তাঁর একটিই প্রশ্ন মনে জাগে, কি করে তিনি তাঁর দেশের এই দৈন্যমোচন করতে পারবেন। তিনি অনুভব করলেন, আমরা উচ্চ ও নিম্ন উভয় বর্ণের মানুষই মনুষ্যত্বের মর্যাদা ভুলতে বসেছি। ‘কি করে এই জাতির উন্নতি সম্ভব’—এই ছিল স্বামীজীর একমাত্র ধ্যেয় বস্তু। উত্তর পেলেন—ভারতবর্ষের মানুষ তখনই জাগবে, যখন তারা সাহস ও আত্মশ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে উঠবে, নিজের প্রতি বিশ্বাস, দেশ ও দেশবাসীর প্রতি ভালবাসা জন্মাবে।
আমাদের সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজ করতে শিখতে হবে। আত্মকলহে আমরা সদাব্যস্ত। কি গ্রাম পঞ্চায়েত, কিবা পৌরসভা সর্বত্রই একচিত্র। যৌথভাবে মানুষের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ কোথাও চোখে পড়ে না। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও অবস্থা অপরিবর্তিত। কোন বড় কাজই একক মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। সবাই মিলে কাজ করে লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য চাই চরিত্রবল। যার অভাব আজ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রত্যেকে আমরা অহমিকায় পূর্ণ। একের চিন্তায় অপরের কোন স্থান নেই। এটি আমাদের চারিত্রিক দুর্বলতা, আর এই কারণে আমরা একসাথে কাজ করার কৌশল আয়ত্তে আনতে পারিনি। কিন্তু এই কৌশল আমাদের শিখতেই হবে কারণ আমাদের প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের এটাই একমাত্র পথ। একমাত্র সঙ্ঘবদ্ধ কর্মপ্রয়াসের মাধ্যমেই আপামর জনসাধারণের শিক্ষাবিস্তার ও নারীজাতির অবস্থার উন্নতি সম্ভব। কন্যাকুমারীতে ধ্যানে বসে স্বামীজীর এই উপলব্ধি হলো। আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ড থেকে ভারতবর্ষে প্রেরিত তাঁর পত্রসমূহে এই সমস্যা বিশ্লিষ্ট হয়েছে গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও তীক্ষ্ণ বিচারশক্তি সহায়ে।
স্বামীজীর এই চিঠিগুলি যুবকদের মনে প্রচণ্ড অনুপ্রেরণা জাগায়। এগুলিতে তিনি আমাদের ভর্ৎসনা করেছেন। বলছেন, ‘তোমরা কি মানুষ? তোমাদের দেশের অসংখ্য লোক অজ্ঞতা ও ক্ষুধায় জর্জরিত, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বঞ্চনা ও শোষণের শিকার, আর তোমরা উচ্চশ্রেণীর শিক্ষিতেরা অকর্মণ্য, উদাসীন! যতদিন ভারতের কোটি কোটি লোক অজ্ঞানে ডুবে থাকবে, ততদিন তাদের পয়সায় শিক্ষিত অথচ তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, এমন প্রত্যেকটি লোককে আমি দেশদ্রোহী মনে করি।’ স্বামীজীর পত্রগুচ্ছের এই অগ্নিময় উক্তিগুলি আমাদের হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, সেবাতে প্রীতি জাগায়।
স্বামী রঙ্গনাথানন্দের ‘গৃহস্থ ধর্ম’ থেকে