সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: মাওবাদী সন্ত্রাসের সময় থেকে ১৬ বছর ধরে নিখোঁজ স্বামী। পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন বেলপাহাড়ীর বাঁশপাহাড়ী গ্রাম পঞ্চায়েতের টংভেদা গ্রামের বধূ মীরা মণ্ডল।
সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: মাওবাদী সন্ত্রাসের সময় থেকে ১৬ বছর ধরে নিখোঁজ স্বামী। পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন বেলপাহাড়ীর বাঁশপাহাড়ী গ্রাম পঞ্চায়েতের টংভেদা গ্রামের বধূ মীরা মণ্ডল।
মীরাদেবীর স্বামীর নাম প্রহ্লাদচন্দ্র মণ্ডল। তিনি ছিলেন পেশায় ঠিকাদার। ২০১০ সালের ১৩ আগস্ট শ্রমিকদের মজুরি দিতে ভীমার্জুন গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আর বাড়ি ফেরেননি। মীরাদেবী সে সময় পুলিস ও প্রশাসনের নীচু থেকে উপরতলা পর্যন্ত, এমনকি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও বিষয়টি লিখিত আকারে জানিয়েছিলেন। কোনো সুরাহা মেলেনি। স্বামীর খোঁজ দিতে পারেনি কেউই। আদৌ তিনি জীবিত, নাকি মৃত, তা নিয়ে আজও অন্ধকারে মীরাদেবী। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটছে মণ্ডল পরিবারের। গোটা জঙ্গলমহল সহ ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ী এলাকাতেও সেই সময় মাওবাদীদের সন্ত্রাসে বিপর্যস্ত ছিল জনজীবন। কখনও গুলির আওয়াজে ঘুম ভাঙত। আবার কখনও ভারী বুটের আওয়াজে। মাওবাদীরা ‘গণ আদালত’ বসিয়ে দেদার হত্যালীলা চালিয়েছিল। এইরকম এক অস্থির সময়ে আশ্চর্যজনকভাবে হারিয়ে যান প্রহ্লাদবাবু। দিনটি ছিল ২০১০ সালের ১৩ আগস্ট। মীরাদেবী সোমবার বলছিলেন, ‘আমার স্বামী ঠিকাদারের কাজ করতেন। ওই দিন কাজের লোকেদের বেতন দেবেন বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে জানতে পারি, তিনি ভীমার্জুন গ্রামে গিয়ে কাজের লোকদের টাকাও দিয়েছিলেন। তার পর দু’টি বাইকে অপরিচিত চারজন এসে কিছু আলোচনা আছে বলে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। বিকেল নাগাদ আমি ফোন করি। ও প্রান্ত থেকে কিছু লোক আমাকে জানায়, আপনার স্বামী ঠিকই আছে। চিন্তার কিছু নেই। এখানে একটি খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেটা সেরেই চলে যাবেন। ভেবেছিলাম রাতে উনি ফিরে আসবেন। কিন্তু আসেননি। পরের দিন বাঁশপাহাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতে গিয়ে খোঁজ নিই। তারা কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। ১৫ আগষ্ট বাঁশপাহাড়ী পুলিশ চৌকি ও বেলপাহাড়ী থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করি। পরবর্তীকালে পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষমহলেও বিষয়টি জানাই। কিন্তু কেউই সুরাহা দিতে পারেনি।’ মীতাদেবী থেমে থাকেননি এখানেও। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকেও স্বামী নিখোঁজের বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। তারপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৬ বছর। সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা সহ কোনো সুযোগ-সুবিধা মেলেনি। এখন মীতাদেবীর দাবি, ‘আমার স্বামী যদি মারা যান, তাহলে ডেথ সার্টিফিকেট পেতে চাই। ডেথ সার্টিফিকেট পেলে তাঁর আত্মসন্তুষ্টির জন্য মাঙ্গলিক ক্রিয়াকর্ম করা যাবে। এই ধরনের ঘটনায় যেসব সরকারি প্যাকেজ ও সহায়তা রয়েছে, তা যেন পাই। বর্তমান সরকারের কাছে এটাই আমার আবেদন।’ ঝাড়গ্রামের বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউ বলেন, ‘ওই পরিবারের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও জেলাশাসকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে মীতাদেবীর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’-নিজস্ব চিত্র