নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: ষষ্ঠীর পরিকল্পনা ছিল শুধুই টইটই। সপ্তমীতে সেটাই হয়ে উঠল সংখ্যাতত্ত্বের লড়াই। তার প্রতিক্রিয়া? ভোর রাত পর্যন্ত ভিড়। দফায় দফায় জলপ্লাবন। ইঙ্গিত মিলেছিল শুক্রবার রাতে। চুঁচুড়া ময়দানের কাছে তখন একপ্রস্ত জিরিয়ে নিতে এসেছিল দুই দল তরুণ-তরুণী। তাঁদের মধ্যেই চলছিল কথোপকথন। শনিবার কিন্তু গোটা জেলাটা ঘুরে ফেলব। প্রস্তাব সামনে আসতেই অন্য দলের জোরাল প্রতিক্রিয়া, পারবি না। তারপর কিছুক্ষণের সংলাপ। শেষপর্যন্ত দু’পক্ষই জেলার দুই ভিন্ন অংশ থেকে সমস্ত পুজো শেষ করার লক্ষ্যে ছুটবে। শনিবার রাতে জলোচ্ছ্বাসের মতো ভিড় দেখে বোঝা গিয়েছিল, ওই দল দু’টি ব্যতিক্রম নয়, বহু দলের প্রতিনিধি মাত্র।
মণ্ডপ ঘোরার ওই প্রতিযোগিতাতেই হুগলির উত্তরপাড়া থেকে চুঁচুড়া, বলাগড় থেকে ডানকুনি, ভিড়ের দাপট আছড়ে পড়ল। মাঝেমধ্যেই বেজে উঠল ফোন। কখনও ভিডিয়ো কল কখনও বা শুধুই কথা। জরিপ হয়ে গেল, কোন গ্রুপের পুজো দেখার সংখ্যা কত। তারপরেই কেউ বাড়িয়ে নিতে চাইল সংখ্যার পাহাড়কে আরও একধাপ। কেউ কেউ পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ করতে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফলাফল সেই এক। ভিড়ের দাপট লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ল হুগলির আনাচকানাচে।
এভাবেই প্রতিযোগিতার আবহে শনিবারের বিকেল থেকে রবিবার কাকভোর পর্যন্ত পাক খেয়েছে তরুণ প্রজন্ম। বিকেলে উত্তরপাড়ার মণ্ডপ ভ্রমণ শেষ করে সন্ধ্যায় জনস্রোত পৌঁছেছে শ্রীরামপুরে। অন্য জনস্রোত তখন জিরাটের পথে প্রান্তরে ঘুরে ঢুকেছে চুঁচুড়ায়। সূর্য ডোবার আগে সেই যে অলিগলি-রাজপথে নিরন্তর পদচিহ্ন আছড়ে পড়তে শুরু করেছিল তা বহমান ছিল রাত পেরিয়ে ভোর অবধি। এভাবেই সপ্তমীর রাত দেখেছে এক বিরল জনপ্লাবন, পথঘাট মুখরিত ছিল জনকোলাহলে। সন্ধ্যার মুখে দেখা হয়েছিল সপ্তর্ষি রায়ের সঙ্গে। সদ্য উত্তরপাড়া ঘুরে দলবল নিয়ে নেমেছেন শ্রীরামপুরে। বললেন, আজ রাতেই সব পুজো শেষ করে ফেলব। একদিনে কত মণ্ডপ ঘোরা যায় তা নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। রবিবার বিশেষ বিশেষ পুজো আবার ঘুরব। নানা রকম পরিকল্পনা আছে। জেলার বাইরের প্রতিমা দেখতেও একদিন যাব। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ষষ্ঠীর রাতে যে দুই দল প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা করেছিল সপ্তর্ষিরা তাঁদের চেনেন না।
অভিষেক, সপ্তর্ষিরা যদি রাতভর মণ্ডপ দাপিয়ে থাকেন তবে পরিবার নিয়ে পুজো দেখতে যাওয়া বা মধ্যবয়সীদের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। প্রবীণদের ভিড় এদিন দেখা গিয়েছে সন্ধ্যার মুখে। আর পরিবার নিয়ে প্যান্ডেল হপিংয়ের ঢল ছিল একটু বেশি রাতে। ফলে রাতে ভিন্ন ভিন্ন সময় জনপ্লাবনের চরিত্র বদলেছে। কিন্তু মানুষের ঢল কমেনি। উল্টে জনস্রোত লাফিয়ে বেড়েছে। শহর চুঁচুড়ায় যেমন ভিড় হয়েছে তেমনই ভিড় দেখা গিয়েছে গ্রামীণ জিরাটে। ডানকুনির পথপ্রান্তর যেমন মুখরিত ছিল তেমনই সপ্তমীতেই বাঁধভাঙা ভিড়ের বিপুল দাপট দেখেছে বৈদ্যবাটি। থিমের চমক, আলোর বাহার, অঘোরী নৃত্যের একাধিক শো সপ্তমীর রাতের মঞ্চে নায়ক হতে চেয়েছে। সেই যোগ্যতা ছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত ভোর রাত অবধি আকাশবাতাস মুখরিত করে রেখে সপ্তমীর নায়ক হয়েছে ভিড়ই। আরও ভালো করে বললে, প্রতিযোগিতাময় ভিড়।



