শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: প্রতি ভোটারের শুনানির জন্য বরাদ্দ মাত্র দু’মিনিট! অর্থাৎ ওই দু’মিনিটেই ভোটারকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি এদেশের ‘নাগরিক’। বিপুল সংখ্যক শুনানি প্রক্রিয়া শেষ করতে এবার এমনই নির্দেশ জারি করল কমিশন। সূত্র মারফত তেমনটাই জানা যাচ্ছে। কমিশনের এহেন নির্দেশের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে সব কিছু মেটাতে গিয়ে ভুল-ভ্রান্তির সংখ্যা বাড়বে না তো? আর তেমনটা হলে আখেরে যে ভোটারকেই বাড়তি হয়রানির শিকার হতে হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসআইআর আতঙ্ক এমনিতেই গ্রাস করে রয়েছে বাংলার আম জনতাকে। প্রতি মুহূর্তে তাড়া করছে ‘অনাগরিক’ হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ। এই প্রক্রিয়া সর্বত্র কার্যকর হওয়ার অর্থ, ভোটারের ভাগ্য ঝুলে থাকবে ওই দু’মিনিটে। ফলে আতঙ্কের পাশাপাশি বাড়বে ক্ষোভও।
কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আনম্যাপড (২০০২ সালের তালিকায় নিজের ও অত্মীয়ের নাম নেই) এবং ডিসক্রিপেন্সি ইন ম্যাপিং বা ‘সন্দেহজনক’ ভোটার মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৪৭ লক্ষ ৮ হাজার ৮৫৩ জন ভোটারের শুনানি হবে। শুনানি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রায় মাস খানেক কেটে গেলেও এ পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি ৬ লক্ষ মানুষকে নোটিস ধরানো গিয়েছে। অর্থাৎ ৪১ লক্ষ মানুষ এখনও নোটিস পাননি। আর এখনও পর্যন্ত শুনানি শেষ হয়েছে? মাত্র ৩৪ লক্ষ। এই পরিস্থিতিতে শুনানি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পূর্ণ করতে ভোটার পিছু বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ‘দু’মিনিট’। এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে শুনানি শেষ করতে হবে ইআরওদের, তার উপায়ও বাতলে দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। মৌখিকভাবে তাঁদের নিদান দেওয়া হয়েছে, যে সব ভোটারের কাছে শুনানির নোটিস গিয়েছে, তাঁদের সমস্ত তথ্য আগে থেকেই তৈরি রাখতে হবে বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও)। অর্থাৎ ভোটারের দেওয়া শুনানির নোটিস প্রাপ্তির কপি, ইনিউমারেশন ফর্ম, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার তথ্য এবং কমিশন প্রদত্ত তালিকার যে কোনো একটি নথির কপি ‘সাজিয়ে রাখতে’ হবে বিএলওদের। সংশ্লিষ্ট ভোটারকে শুনানির জন্য ডাকার পর সমস্তটা এইআরওর কাছে তুলে দিতে হবে। নথিগুলি পাওয়া মাত্রই তিনি ভোটারের সঙ্গে ছবি তুলবেন এবং সব নথি আপলোড করে দেবেন। আর সবটাই করতে হবে দু’মিনিটের মধ্যে।
এছাড়াও জানা গিয়েছে, শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটার ইনিউমারেশন ফর্মে যে আত্মীয়ের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁর নথিও আগে থেকে সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে বিএলওদের। যাঁরা কোনও নথি দিতে পারবেন না, তাঁরা সাদা কগজে লিখে স্বাক্ষর করে জানাবেন ফর্মে উল্লিখিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাঁর অমুক আত্মীয়। সেই কাগজও আপলোড করতে বলা হয়েছে এইআরওদের। এবার তাই প্রশ্ন উঠছে, দু’মিনিটে শুনানি শেষ করার পর সেই নথি যথাযথ উপায়ে যাচাই করা হবে তো? কারণ এখনও পর্যন্ত শুনানিতে জমা পড়া মাত্র ১৫ লক্ষ নথি যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছেন জেলাশাসকরা। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, সঠিকভাবে সমস্ত নথি যাচাই হবে? নাকি জমা পড়া সমস্ত নথি যাচাই না করেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হবে? বিশেষত যাঁরা সাদা কাগজে লিখে আত্মীয়ের নথি পেশ করছেন, তাঁদের ওই স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য হবে তো? সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।