ছত্রিশের এক সাউথ এন্ড পার্ক, বাড়িটা আজ সত্যিই পরিত্যক্ত হয়ে গেল। বহু বছর আগে থেকেই বাড়িটা জনমানবহীন হয়ে পড়েছিল। জানলার ভাঙা খড়খড়িগুলো দিয়ে হাওয়া ঢুকে কেঁদে ফিরত। রংচটা দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ত। তবু বাড়িটা জানত তার এক মালকিন আছে। দোতলার বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে যে কোনো এক সন্ধ্যায় হয়তো গুনগুনিয়ে উঠেছিল— ‘চোখে নামে বৃষ্টি বুকে ওঠে ঝড় যে, তুমি তো আমারই ছিলে, আজ কত পর যে...।’ আজ আর সেও রইল না। আজ বাড়িটা সত্যিই অনাথ। ১৯৭৯ সালে দেব বর্মন পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে এই বাড়িতে পদার্পণ করেছিলেন আশা ভোঁসলে। তারপর এ বাড়ির ছেলে পঞ্চমের সঙ্গে অ্যান্ডারসন ক্লাব, গড়িয়াহাট রোড, নিউ মার্কেট, ঢাকুরিয়া লেক, প্রিন্সেপ ঘাট কত ঘোরাঘুরি। সর্ষে বাটা দিয়ে মাছের ঝোল কীভাবে রাঁধে?, আচ্ছা নতুন গুড়ের সন্দেশ কোন দোকানের ভালো? কলেজ স্ট্রিটে নিয়ে যাবে, শরৎচন্দ্র আর আশাপূর্ণা দেবীর বই কিনব! শ্বশুরবাড়ির শহরের সঙ্গে এইভাবেই তাঁর গড়ে উঠেছিল এক আত্মিক সম্পর্ক। আসলে মারাঠি আর বাঙালি সংস্কৃতির অনেক মিল আছে। আশার বাবা ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী, তাঁর একটা থিয়েটারের দলও ছিল। সেই সূত্রেই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় সেই ছোট্টবেলা থেকে। বাবার থেকে শুনেই পড়ে ফেলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’, অবশ্যই মারাঠি অনুবাদে। তারপর শরৎচন্দ্র, আশাপূর্ণা দেবীর একের পর এক বই। ভালোবাসতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর আর গায়কী। তাই ছেলে হওয়ার পর নাম রেখেছিলেন হেমন্ত। কে জানত, সেই বাঙালি পরিবারেই তাঁর ঠাঁই হবে শেষপর্যন্ত। এই সাউথ এন্ড পার্কের বাড়ি ঘিরেই তো কত স্মৃতি ছিল তাঁর। আর ডি বর্মনের সঙ্গে গড়িয়াহাটের এক বিখ্যাত দোকানে গিয়েছেন শাড়ি কিনতে। বোম্বের দুই দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞ এসেছেন, দোকানের মালিক তো গদগদ। একটার পর একটা শাড়ি দেখিয়ে যাচ্ছেন। হেঁকে বললেন, অ্যাই রন্টু চা নিয়ে আয়। আশা শাড়ি পছন্দ করলেন, দরদাম হল, কেনাও হয়ে গেল। কিন্তু চা আর এসে পৌঁছলো না। সেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কয়েক বছর আগেও হেসে গড়িয়ে পড়তেন। কলকাতার মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতেন। ফাংশান করতে এসে রাতবিরেতে দোকান খুলিয়ে মিষ্টি নিয়ে গিয়েছেন বোম্বেতে। শাড়ি কিনতে হলে কলকাতাই ছিল তাঁর প্রথম পছন্দ। আর বাংলা ভাষা তাঁর কাছে ছিল নতুন গুড়ের সন্দেশের মতোই মিষ্টি। বুঝতে তো কোনো অসুবিধেই হতো না। আধো আধো স্বরে বলতেও পারতেন। আর ডি বর্মনের সুরে পুজোয় বহু হিট গান উপহার দিয়েছেন। তবে আশাকে প্রথম বাংলা গান গাইয়েছিলেন কিন্তু সুধীন দাশগুপ্ত। ১৯৫৮ সালে বেরিয়েছিল সেই রেকর্ড— ‘নাচ ময়ুরী নাচ রে’ আর ‘আকাশে আজ রঙের মেলা’। সাউথ এন্ড পার্কের দোতলার বারান্দায় আর ছাদে বেতের চেয়ারে বসে পঞ্চমের সঙ্গে কত সুরেলা সন্ধে কেটেছে তাঁর। পঞ্চমের কলকাতার বন্ধু বান্ধবরা এসেছেন সেই আড্ডায়। আর ডি নিজে যেমন রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন, তেমনই আশাও ছিলেন ভালো রন্ধনশিল্পী। স্বামীর থেকেই শিখে নিয়েছিলেন নানা বাঙালি পদ রান্নার কায়দা কানুন। কলকাতায় এলেই গাড়ি নিয়ে দু’জনে বেরিয়ে পড়তেন এদিক সেদিক। কখনও বসিরহাট, কখনও বর্ধমান। দুরন্ত বেগে গাড়ি চালাতে চালাতে সুর ভাঁজতেন পঞ্চম। আশা বলতেন, অত জোরে চালিও না আমার ভয় করে। একজনের চলা তো অনেক আগেই থেমে গিয়েছে। বাড়ির মালকিনের পথচলাও থেমে গেল এবার। পরপারে কেউ হয়তো ডেকেছিলি, ‘ফিরে এস অনুরাধা ভেঙে দিয়ে সব বাধা...।’ আশা হয়তো গেয়ে উঠেছেন, ‘ফিরে এলাম দূরে গিয়ে আমি তোমার অনুরাধা...।’



