নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সন্ধ্যা নামছে। মোহন বাগান তাঁবু জুড়ে আলোর মায়াজাল। অমর একাদশের মূর্তির সামনে সেলফি তুলতে ব্যস্ত কয়েক প্রজন্ম। লাউডস্পিকারে গান ভাসছে, ‘আমাদের সূর্য মেরুন। নাড়ির যোগ সবুজ ঘাসে। আমাদের খুঁজলে পাবে, সোনায় লেখা ইতিহাসে...।’ বনেদিয়ানা, আভিজাত্য, ইতিহাস, মোহন বাগান দিবসে নানা রঙের কোলাজ। প্রবল বৃষ্টি হোক বা যানজট — সমর্থকদের দমাতে পারেনি কোনওকিছুই। ময়দানি ক্যানভাস জুড়ে আবেগের জলছবি।
১৯১১ সালের ২৯ জুলাই। বৃষ্টিভেজা গড়ের মাঠ জনসমুদ্র। ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে বশ মানিয়ে আইএফএ শিল্ড ছিনিয়ে নেন শিবদাস, বিজয়দাস, অভিলাষরা। খালি পায়ে বুট পরিহিত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মোহন বাগানের লড়াই স্থান পেয়েছে ইতিহাসের পাতায়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ঝড় তোলে অমর একাদশের সংগ্রাম। গর্বের পালতোলা নৌকো শতবর্ষ পেরিয়েও আপন গতিতে প্রবাহমান। ঐতিহাসিক দিনে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাবকে শুভেচ্ছা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোহন বাগান সুপার জায়ান্টের কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কাও অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।
মঙ্গলবার অমর একাদশের মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, অমর জ্যোতি প্রজ্জ্বলনের পাশাপাশি উত্তোলিত হয় ক্লাব পতাকা। এরপর ঘরের মাঠে প্রদর্শনী ম্যাচে মাতিয়ে দিলেন প্রাক্তনীরা। সন্ধ্যার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম যেন এক টুকরো ইন্দ্রপুরী। সৌরভ গাঙ্গুলি, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অরূপ বিশ্বাস, সুজিত বসু, স্নেহাশিস চক্রবর্তীদের উপস্থিতিতে চাঁদের হাট। সৌরেন্দ্র-সৌম্যজিতের গান অনুষ্ঠানের সুর বেঁধে দেয়। মূল আকর্ষণ অবশ্যই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। গত মরশুমের সেরা ফুটবলার হয়েছেন আপুইয়া। সেরা প্রতিশ্রুতিমান তারকা দীপ্যেন্দু বিশ্বাস। এই সম্মান নিশ্চয়ই বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। সেরা স্ট্রাইকার জেমি ম্যাকলারেন। জন্মদিনে এটাই বোধহয় অজি তারকার সেরা উপহার। জীবনকৃতি সম্মান পেলেন রাজু মুখার্জি। অসুস্থতা ছাপিয়েও প্রাক্তন বঙ্গ ক্রিকেটারের মুখে হাজার ওয়াটের আলো। এশিয়ান কাপে যোগ্যতা অর্জনকারী মহিলা ভারতীয় দলের সদস্যরাও মঞ্চে উপস্থিত। সেরা ক্রিকেটার রণজ্যোৎ সিং খৈরা। হকিতে কেশব দত্তের নামাঙ্কিত ট্রফি পেলেন অর্জুন শর্মা। তবে সেরা ফ্রেম অবশ্যই রত্ন সম্মান জ্ঞাপন। মোহন বাগানে টুটু বসুর অবদান অনস্বীকার্য। ক্লাবের বিপদে তিনিই ‘গৌরী সেন।’ অঝোরে কেঁদে টুটু বললেন, ‘রত্ন সম্মান আকাশের চাঁদ পাওয়ার সামিল। প্রার্থনা করুন, পরের জন্মেও যেন মোহন বাগানি হয়ে জন্মাই।’
কর্মযজ্ঞ সামলে তৃপ্ত কর্তারা। নির্বাচনী আবহে দেবাশিস বনাম সৃঞ্জয় ছিলেন যুযুধান পক্ষ। এদিনের মঞ্চে আরও একবার একসাথে পথ চলার অঙ্গীকার। সভাপতি দেবাশিস দত্তের মন্তব্য, ‘টুম্পাই না চাইলে ওর হাত ছাড়ব না।’ সৃঞ্জয় বসু বললেন, ‘সমর্থকদের আবেগই আমাদের প্রেরণা।’ ইস্ট বেঙ্গল ও মহমেডান স্পোর্টিংয়ের তরফে ফুলের তোড়া ও মিষ্টির হাঁড়ি তুলে দেওয়া হয় কর্তাদের হাতে। চিরকালীন রেষারেষির বাইরে গিয়ে ময়দান মিলল মোহন বাগান দিবসে। শেষ পর্বে ইমন চক্রবর্তীর গানে মধুরেণ সমাপয়েৎ।