কথায় বলে, শব্দই ব্রহ্ম। প্রতিনিয়ত চারপাশে কত শব্দের ছড়াছড়ি। কিছু কথা মাথায় রেখে দেওয়া মাস্ট। আবার কোনও শব্দ এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দেওয়াই দস্তুর। তবে চারিদিকের এত শব্দ মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করে ককলিয়ার। শব্দকে স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেতের আকারে মাথায় পাঠায়। আর এই প্রক্রিয়া যখন ব্যাহত হয়, তখনই কৃত্রিম ককলিয়ার বসানোর প্রয়োজন পড়ে।
কানের ভিতরের অংশ মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। ১৮০০ সালে একটি পরীক্ষায় বিষয়টি জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকরা বোঝেন এই তিনটি অংশের মধ্যে শ্রবণের জন্য অপরিহার্য ককলিয়ার। কিন্তু কারও যদি এই ককলিয়ারেই সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে? এই বিষয়টি ভাবাত চিকিৎসকদের। কৃত্রিম ককলিয়ার বসানোর ভাবনা নিয়ে গবেষণা শুরু হল ১৯৫৭ সালে। আন্দ্রে জোর্নো ও চার্লস আইরিশ নামের দুই বিজ্ঞানী একটি চ্যানেল ব্যবহার করে কানের ভিতরে শ্রবণের উদ্দীপনা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে বিজ্ঞানী উইলিয়াম হাউজ একটি যন্ত্র আবিষ্কার করলেন। তাঁর তৈরি যন্ত্রটি কার্যকরী না হলেও ভবিষ্যতে তাঁর থিসিস পেপারটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হয়ে উঠেছিল। এদিকে, ১৯৬৪ সালে ব্লেয়ার সিমন্স ও রবার্ট এল হোয়াইট স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক রোগীর ককলিয়ার-এ একটি এক চ্যানেল বিশিষ্ট যন্ত্র প্রতিস্থাপন করান। যদিও পরে দেখা যায়, এই যন্ত্র খুব বেশি কার্যকরী নয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে রবিন মাইকেলসন ও তাঁর সহকর্মী মেলভিন বার্টজ একধরনের কৃত্রিম ককলিয়ার তৈরি করলেন। এই ডিভাইসটি ৪ জন বধির মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনও করা হয়। রিপোর্টে দেখা গেল, তাঁরা স্বল্প হলেও শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। ১৯৭১ সালে আমেরিকার ওটোলজিক্যাল সোসাইটির বার্ষিক সভায় এই বিষয়টি উপস্থাপিত হলেও চিকিৎসক মহলে সমাদৃত হয়নি। আরও গবেষণা হতে থাকে।
এরপর ককলিয়ার ইমপ্লান্ট নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রেম ক্লার্ক। মাত্র ১০ বছর বয়সে স্কুলের শিক্ষককে তিনি জানিয়েছিলেন, কানের চিকিৎসকই হবেন তিনি। কেন? তাঁর বাবা ছিলেন বধির। ফলে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যে কী সমস্যার মুখে বাবাকে পড়তে হতো, তা বুঝতে পেরেছিলেন গ্রেম। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বধির ব্যক্তিদের শ্রবণ শক্তি ফেরানোর উপর গবেষণা শুরু করেন তিনি। এভাবেই তৈরি করলেন ককলিয়ারের প্রথম মাল্টি-চ্যানেল নিউক্লিয়াস। অত্যন্ত ছোট এই যন্ত্রটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কানের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া সম্ভব। ১৯৮২ সালে এক রোগীর ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করেছিলেন তিনি। এখানে আরও একজনের কথা বলতে হবে। তিনি অস্ট্রিয়ার ইনজেবর্গ হোকমায়ার। ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করেছিলেন তিনি। ক্লার্ক ও ইনজেবর্গের আবিষ্কার আধুনিক ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টের পথপ্রদর্শক।
একটা জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন, কিছু ক্ষেত্রে ইমপ্ল্যান্ট সম্পূর্ণভাবে কাজ নাও করতে পারে। প্রধানত, যে সব শিশুরা জন্মগত বধির, তাদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করার সুযোগ থাকে। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলে, এই অস্ত্রোপচার করেও আর লাভ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়, যে একজন শুনছিল, আচমকা আর শুনতে পাচ্ছে না। এমন হলে ১২ বছর পর্যন্ত সময় থাকে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, হিয়ারিং এড-এর সঙ্গে ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টের ফারাক কোথায়? বুঝতে হবে, হিয়ারিং এড যন্ত্রটি বাইরে থেকে বসানো হয়। এর জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না। শব্দের মাত্রা বাড়িয়ে কানে পৌঁছে দেওয়াই হল হিয়ারিং এড-এর কাজ। তবে ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট হল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কানে শব্দের কম্পনের উদ্দীপনা তৈরি করা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে করতে হলে ১০-১৫ লক্ষের মতো খরচ পড়ে ককলিয়ার ইমপ্লান্টে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিখরচায় করা যায় এই অপারেশন। রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে বহু শিশুর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত (তথ্য সহায়তা: বিশিষ্ট ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরুণাভ সেনগুপ্ত)