সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: কাটমানি, তোলাবাজির জায়গায় এখন নতুন শব্দবন্ধ ‘গ্রামোন্নয়ন চাঁদা’! বদলের পশ্চিম বর্ধমানে বালিঘাটগুলিতে শুরু ‘শুদ্ধিকরণ অভিযান’। তার উপর বালির চাহিদার তুলনায় জোগান কম। সুযোগ বুঝে অসাধু ব্যবসায়ীরা বালি নিয়ে কালোবাজারি করতে শুরু করে দিয়েছে। ফলে, একদিকে ‘শুদ্ধিকরণ’, অন্যদিকে কালোবাজারি—এই দুইয়ের যুগপৎ ক্রিয়ায় বালির দাম এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পালাবদলের পরও সুরাহা মেলেনি সাধারণ মানুষের। তাই, বালির দামে রাশ টানতে তৎপর হয়েছেন দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বালির কালোবাজারি করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দায়ের হবে এফআইআর। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তারও।
নির্মাণশিল্পে অপরিহার্য সামগ্রী বালি। সরকারি প্রকল্পে বাড়ি করতেও এই ইমারতি দ্রব্যের চাহিদা এখন তঙ্গে। সেই বালি কারবার নিয়ে পূর্বতন শাসকদলের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ উঠছিল। বিশেষ করে তৃণমূল নেতাদের তোলাবাজি, কাটমানির জেরে বালি হয়ে উঠেছিল একরকম মহার্ঘ। সরকার বদল হলেও দাম বাড়ছে লাফিয়ে। বিষয়টি জানার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাম নির্দিষ্ট করতে উদ্যোগী হন। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। দুর্গাপুর থেকে কুলটি সর্বত্রই বালির দাম আকাশছোঁয়া। বালির এই কালোবাজারি রুখতে কড়া বার্তা দিয়ে রাখলেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বিধায়ক চন্দ্রশেখর। অসাধু ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ভুলে যাবেন না, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার চলছে। কোনওরকম অন্যায় হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইচ্ছে করে কেউ বালির দাম বাড়িয়ে সমস্যায় সৃষ্টি করলে থানায় তাঁর নামে এফআইআর করব। পুলিশকে বলব অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে।’
কিন্তু কীভাবে চলছে বালিঘাটের ‘শুদ্ধিকরণ’? এতদিন বালিঘাটগুলির একছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তৃণমূল নেতা ও তাঁর অনুগামীদের হাতে। সরকারি বৈধ ঘাটগুলি থেকে লরি পিছু কাটমানি তোলা হতো। কোথাও কোথাও তোলাও নেওয়া হয় লরি পিছু। পাশাপাশি, তৃণমূলের একাংশ নেতার নিয়ন্ত্রণে চলত অবৈধ ঘাটও। এইসব ঘাটগুলি থেকেই ট্রাক্টরে করে আসানসোল, দুর্গাপুর, কুলটি শহরের চাহিদা মতো বালি সরবরাহ হতো। বেশিরভাগ বৈধ ঘাট থেকে দৈত্যকার লরিতে করে বালি কলকাতা ও কলকাতা শহরতলির উদ্দেশে পাড়ি দিত। তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পরই বালিঘাটগুলি কার্যত ‘অনাথ’ হয়ে পড়ে। বিজেপির একাংশ এখন বালিঘাটগুলির এইসব অনিয়ম দূর করতে ‘শুদ্ধিকরণ’ করছে। আর এই ‘শুদ্ধিকরণ’ বলতে গ্রামোন্নয়নের নামে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা আদায়। যাকে নতুন শব্দবন্ধে বলা হচ্ছে—‘গ্রামোন্নয়ন ট্যাক্স’। বিজেপির একটা অংশ আবার নব্য নেতাদের সৌজন্যে চালু হওয়া ‘শুদ্ধিকরণ’ মানছে না। টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি জামুড়িয়ার দরবারডাঙা ও বীরকুলটি ঘাটে এনিয়ে অশান্তি হয়। অভিযোগ, বালির মধুভাণ্ডে দখলদারি নিয়েই যত গোলমাল।
এদিকে, প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে আপাতত অবৈধ বালিঘাটগুলি বন্ধ। তাতে বালির সংকট তৈরি হয়েছে। কুলটিতে এক ট্রাক্টর বালি বাড়ি পর্যন্ত আনতে খরচ পড়ছে ৫ হাজার টাকা। দুর্গাপুরে সেই বালি আনতে লেগে যাচ্ছে সাত হাজার টাকা। কুলটিতে বালি আনতে হচ্ছে ঝাড়খণ্ড থেকে। দুর্গাপুরের বালি আসছে সোনামুখী থেকে। ফলে সরকারি প্রকল্পে বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সমস্যা মেটাতে সম্প্রতি জেলাশাসক জেলার প্রতিটি বিএলএলআরওদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, বৈধ বালিঘাটগুলি থেকে বালি কারবার দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে। জেলা প্রশাসন অবগত, সামনেই বর্ষা। তার আগে নদী থেকে পর্যাপ্ত বালি তোলা না হলে পরবর্তীকালে বালির সংকট আরও বাড়বে। জেলাশাসক পোন্নমবলম এস বলেন, ‘বৈধ বালিঘাটগুলি দ্রুত চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিএলএলআরওদের। স্থানীয়ভাবে বালির চাহিদা কীভাবে বৈধ ঘাটগুলি থেকে মেটানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।’