পিনাকী ধোলে, মহম্মদবাজার: মহম্মদবাজারের দেউচা-পাচামি পাথর শিল্পাঞ্চলের খুন্তিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ালে পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। মেরেকেটে দশ মিটার দূরেই হাঁ করে আছে এক বিশাল পাথর খাদান। দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় ব্লাস্টিং। কান ফাটানো শব্দে থরথর করে কাঁপতে শুরু করে ক্লাসরুম থেকে ব্ল্যাকবোর্ড। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার এমন কঙ্কালসার, হাড়-হিম করা ছবি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ব্লাস্টিংয়ের বারুদ-গন্ধে আর পাথর ভাঙার অবিরাম শব্দে এখানে রোজ একটু একটু করে ‘খুন’ হয় শৈশব।
স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে একজনও পড়ুয়া নেই। প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্র আট। প্রধান শিক্ষক সনাতন চুনারি বলছিলেন, ‘২০০৯ সালে যখন স্কুলে যোগ দিই, তখন ৬৩ জন পড়ুয়া ছিল। গ্রামে ৩৮টা পরিবার বসবাস করত। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬টায়। খাদান কর্তৃপক্ষকে জমি বিক্রি করে পালিয়েছে সবাই। যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, অত্যন্ত দুঃস্থ, তাদের বাড়ির শিশুরা শুধু আসে এখানে। এবছরও ১৫জনকে স্কুলে ভরতি করিয়েছিলাম। প্রায় প্রত্যেকেই চলে গিয়েছে। বারোমেশিয়া, শালডাঙা থেকে শুরু করে আশপাশের স্কুলগুলির অবস্থাও প্রায় এক।’
প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলের ছবিটা আরও ভয়ানক। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চলা গিরিজোড় সাঁওতাল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। উচ্চ মাধ্যমিকে ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃত পড়ানোর মতো কোনো শিক্ষক নেই। স্কুলের সহকারী শিক্ষক দেবকুমার সিংহের আক্ষেপ, ‘পাঁচজনে মিলে কি এত বড় স্কুল চালানো যায়? কেউ ছুটিতে থাকলে ক্লাস কার্যত লাটে ওঠে। টিফিনের পর পড়ুয়াদের আটকে রাখা যায় না। জোড়াতালি দিয়ে কী আর ভবিষ্যৎ গড়া যায়?’ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লক্ষ্মী মাণ্ডি বলছিলেন, ‘সবার নজর শুধু এই অঞ্চলের পাথর লুটের দিকেই। শিক্ষার দিকে নজর নেই কারও।’ ফলস্বরূপ, গতবছর যে স্কুলে পড়ুয়া ছিল ৬৪৫ জন, এবছর তা একধাক্কায় কমে ৪৮৫! যারা স্কুলছুট হচ্ছে পেটের দায়ে তারা অচিরেই জুটে যাচ্ছে খাদানের শ্রমিকের কাজে। আদিবাসী পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতে একটি নতুন হস্টেল তৈরি হলেও প্রশাসনের উদাসীনতায় তা তালাবন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
গিরিজোড় প্রাথমিক স্কুলের অবস্থাও তথৈবচ। খাতায়-কলমে একশো পড়ুয়া থাকলেও দৈনিক উপস্থিতির সংখ্যা অর্ধেকেরও কম। প্রধান শিক্ষক কার্তিক টুডু সহ মাত্র দু’জন শিক্ষকের ভরসায় স্কুল চলছে। কার্তিকবাবু বলেন, ‘দুজনের ভরসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ভরতি নিতে পারি না। হাইস্কুলে পাঠিয়ে দিই।’
বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা জেনেও পড়াশোনা করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে পূর্ণিমা মার্ডি, নমিতা সোরেন, মনীষা দাসরা। ডাম্পারের মৃত্যুভয় উড়িয়ে বইয়ের ব্যাগ বুকে জাপটে জলকাদা ভেঙে প্রতিদিন স্কুলে যায় ওরা। মনীষার বাবা গাড়ি চালায়। পূর্ণিমার বাবা নেই। অভাবের সংসারে উনুন জ্বালাতে তার মা এখন গ্রামের অন্য মহিলাদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাম্পার আটকে চাঁদা তোলে। এটাই এখন পাচামির বহু মহিলার ‘অলিখিত’ রুটিরুজি। মায়ের এই অপমান পূর্ণিমা বোঝে। কিন্তু, সরকার কি বোঝে?
পূর্বতন সরকারের নেতামন্ত্রীরা টুলু মণ্ডলের মতো মাফিয়াকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা লুট করেছে। নজর দেয়নি শিক্ষার দিকেই। আর বর্তমান সরকার ১০০কোটি রাজস্বের নেশায় বুঁদ। কিন্তু, এই পাথরের নিচেই নীরবে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে পূর্ণিমাদের শৈশব। চিরতরে মুছে যাচ্ছে দেউচা-পাচামির একটা গোটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। সেই খবর আছে রাষ্ট্রের কাছে? (চলবে)