সৌম্যজিৎ সাহা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বাবা-মায়ের কাছে ছোটবেলায় গল্প-কাহিনি শোনে অনেকেই। কিন্তু সেই গল্পকে নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করে কতজন? ডায়মন্ডহারবারের অদিত্রি এখানে ব্যতিক্রম। বাবার কাছে একদিন শুনেছিল, যক্ষ্মা রোগীদের ওষুধের সঙ্গে উপযুক্ত পথ্যও জরুরি। নাহলে রোগ সারে না। গরিব, হত দরিদ্র রোগীরা সেই খাবার পাবে কোথায়? সেই গল্প মনে গেঁথে গিয়েছিল তার। অদিত্রি এখন দশে পা দিয়েছে। সরিষার এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। একটু বড় হতেই নাড়া দিয়ে ওঠে তার মন। বাবাকে বলে, সে একজন যক্ষ্মা রোগীর দায়িত্ব নিতে পারে। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সে খাবারের খরচ জোগাবে সেই রোগীকে।
এর মধ্যেই বাবা দেবব্রত মণ্ডল একদিন কথায় কথায় আইজুল মোল্লার কথা বলেন বাড়িতে। দেবব্রতবাবু দক্ষিণ ২৪ পরগনা স্বাস্থ্য জেলার টিবি হেলথ ভিজিটর। তাঁর মুখে আইজুলের কথা শুনে স্বপ্নকে ছুঁতে চায় অদিত্রি। আইজুল মোল্লার বাড়ি মহেশতলায়। তিন চাকার প্রতিবন্ধী সাইকেলে চেপে তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা চেয়ে বেড়ান। তাতে যেদিন যতটুকু রোজগার হয়, তাতে কোনওদিন একবেলা, কোনওদিন আধপেটা খেয়ে দিন কাটে তাঁর। মাসখানেক আগে এই ভিক্ষুক শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মহেশতলা পুরসভার এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন। পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে বিনা পয়সায় ওষুধ না হয় মিলবে, কিন্তু পুষ্টিগুণ যুক্ত খাবার জুটবে কোথা থেকে? আজিজুল স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছেই খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আর্জি জানান। সেইসূত্রে এই যক্ষ্মা রোগীর কথা জানতে পারেন দেবব্রতবাবু। বাড়িতে এসে সেই কথা বলতেই অদিত্রি জানায়, ওই রোগীর পাশে দাঁড়াতে সে তৈরি। মেয়ের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতেই তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের নিক্ষয় মিত্র (যাঁরা যক্ষ্মা রোগীদের দত্তক নেন) প্রকল্পের সঙ্গে জুড়ে দেন আজিজুলকে। এভাবেই ওই যক্ষ্মা রোগীকে খাবার জোগানের দায়িত্ব পায় অদিত্রি।
সরকারি প্রক্রিয়া মিটিয়ে ২৭ মে আজিজুল মোল্লার নিক্ষয় মিত্র হয়ে উঠেছে অদিত্রি। ওইদিনই টিফিনের বাঁচানো টাকা দিয়ে এক মাসের খাদ্যশস্য তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে ওই ছাত্রী। অদিত্রির বক্তব্য, ‘টিফিন খরচ থেকে টাকা জমিয়ে লক্ষ্মীর ঘটে রাখতে শুরু করেছি। সেই টাকা দিয়েই প্রতি মাসে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেব ওনাকে। নিয়ম অনুসারে, নিক্ষয় মিত্র হলে ছ’মাস সংশ্লিষ্ট যক্ষ্মা রোগীকে খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করতে হয়। এই ছ’মাস তো দেবই, প্রয়োজনে অন্যভাবেও সাহায্য করতে রাজি’। যক্ষ্মা রোগীদের দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনিতেই অনীহা রয়েছে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এক খুদে এগিয়ে এসে সাহায্য করছে, তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। অদিত্রির বাবার বক্তব্য, ‘সমাজের কল্যাণে এমন রোগীদের জন্য আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এগিয়ে আসুক, এই আবেদনই সবার কাছে রাখছি।’ -নিজস্ব চিত্র