Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

চণ্ডীরূপা শ্রীচণ্ডিকা

চণ্ডীরূপা শ্রীচণ্ডিকা
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
মাতৃসাধনার ঐতিহ্য এবং তাকে ঘিরে অলৌকিক কাহিনি নিয়ে লিখেছেন পূর্বা সেনগুপ্ত।
Advertisement
তন্ত্রপীঠ
বাংলাকে শাক্তধর্মের দেশ বা ‘শক্তিপ্রধান দেশ’ বলা হয়। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়োর যুগ থেকে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, তন্ত্রে এই শক্তিসাধনার উল্লেখ আছে। ভারতে মাতৃসাধনার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তা বিন্ধ্যপর্বতকে কেন্দ্র করে। উত্তর, দক্ষিণ এবং পূর্বে প্রধানত তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণাংশ ‘অশ্বক্রান্তা’ নামে, বিন্ধ্যপর্বতের উত্তরে কাশ্মীর পর্যন্ত ‘রথক্রান্তা’ নামে এবং বিন্ধ্যপর্বত থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভারতের পূর্বাঞ্চল ‘বিষ্ণুক্রান্তা’ নামে পরিচিত। বিষ্ণুক্রান্তার অন্তর্ভুক্ত বঙ্গদেশে শক্তিসাধনা ‘কালীকুল’ নামে এক বিশেষ ধর্মসাধনার রূপ লাভ করে। বাংলার মাতৃসাধকগণ এই কালীকুল সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।
বঙ্গভূমি তন্ত্র সাধনার জন্য প্রকৃষ্ট। শক্তিসাধনা ও শাক্তপীঠের সঙ্গমে এই ভূমির প্রতিটি ধূলিকণা পূত, পবিত্র। নারায়ণ উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘অশ্বক্রান্তে রথক্রান্তে বিষ্ণুক্রান্তে বসুন্ধরে শিরসা ধারয়িয্যামি রক্ষস্ব মাং পদে পদে।।’
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল। সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রধান সতীপীঠ কামাখ্যাতীর্থ অসম অঞ্চলেই। যা তন্ত্রের পীঠস্থান।
যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী 
দেবী আরাধনার ক্ষেত্রেও বঙ্গভূমি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে মাতৃ আরাধনায় মগ্ন হয়। মহা শক্তিময়ী দেবী বাঙালির কাছে স্নেহপুত্তলি, একান্ত ভালোবাসার কন্যা। যিনি শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য পিতৃগৃহে বেড়াতে আসছেন। কিন্তু তিনি তো হিমালয় কন্যা, তাহলে তাঁর পিতৃগৃহ বাংলায় হল কী করে? এই প্রশ্ন যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন এর উত্তর হবে একটাই, হিমালয়ের পাদদেশে হরিৎক্ষেত্র মণ্ডিত এই বঙ্গভূমি হল শক্তিসাধনার জন্য প্রকৃষ্ট। তাই দেবী এখানে খুব আপন হয়ে ধরা দিয়েছেন বারংবার। তিনি রামপ্রসাদের কাছে মা হয়ে ধরা দিয়েছেন, কমলাকান্তের বেড়া বেঁধেছেন, মাতৃসাধক শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আনন্দময়ী জননী রূপে প্রকটিত হয়েছেন। তিনি নিকটে এসেছেন, কিন্তু সেই নৈকট্য তাঁর মহিমাকে খর্ব করেনি কোনওকালে। সকল সাধকই তাঁর মহিমাময় শক্তিময়ী রূপকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বারংবার। একদিন দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে একটি নববিবাহিতা কন্যা এসেছেন। মন্দিরের কর্মচারীদের আত্মীয় হবেন হয়তো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে আঁচলে চাবির গোছা বেঁধে বনবন করে ঘোরাচ্ছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে দেখতে পেয়ে ভাগনে হৃদয়কে বললেন, ‘ওই দেখ হৃদু মা ঠিক এমনভাবে জগৎকে চালাচ্ছেন।’ কী মহিমময়ী শক্তি যিনি আঁচলে বাঁধা চাবির মতো অনায়াসে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে পরিচালিত করে চলেছেন। তাঁর ভ্রূভঙ্গে জগৎ চলছে। তাঁর এক পদক্ষেপ সৃষ্টি, অপর পদক্ষেপ ধ্বংস সাধিত করছে অনায়াসে। সেই শক্তিরই আরাধনায় ব্রতী আমরা।
শক্তির আরাধনা বাঙালির রক্তের মধ্যে প্রবাহিত। যেখানেই যাও একটি কালীমন্দির পাওয়া যাবে। কালীমন্দির ছাড়া বাঙালি বাঁচতেই পারে না। কালী দুর্গারই আর এক রূপ। বাংলার নবজাগরণের পূর্বক্ষণে যেসব ধনী বাঙালির উদ্ভব হয়েছিল তাঁদের মধ্যে দুর্গাপূজা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাড়ির কুলদেবতা যাই হোক না কেন, দুর্গামণ্ডপে দেবীপূজা করতেই হবে। এই ক্ষেত্রে শোভাবাজার রাজবাড়ির নবকৃষ্ণ দেবকে পথিকৃৎ বলা যায়। তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে হৃদ্যতাবৃদ্ধির জন্যই দুর্গাপূজায় এলাহি আয়োজনের সূচনা করেন। প্রাচীন গ্রামগঞ্জে জমিদার বা সেই গ্রামের সমৃদ্ধ পরিবারেই দেবী আরাধনার আয়োজন হতো। সেই একটি পূজাকে কেন্দ্র করে সমস্ত গ্রামবাসী আনন্দে মেতে উঠতেন, শুধু তাই নয় সেই পূজায় অংশগ্রহণও করতেন সকলেই। দুর্গাপূজাকে কলির অশ্বমেধ যজ্ঞ বলা হয়। সমাজের সব সম্প্রদায় একত্রে অংশগ্রহণ করে তা সমবেত আরাধনায় পরিণত করে। দেবীরূপ বিভিন্ন, কাহিনিও বিভিন্ন। শরৎকাল এলেই আগমনী গান, শরৎকাল হলেই চণ্ডীমণ্ডপে চণ্ডীপাঠের সূচনা। সেই শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশ ফুলের দোলা। দেবী আসবেন তাই মহালয়ার আগেই ঘরদোর পরিষ্কার করে প্রস্তুত থাকে সকলে। পূর্বে একমাস আগে থেকে পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো আগমনী গান। এখন তা দেখা না গেলেও আগমনী গানের ধারাটি রয়ে গিয়েছে। এই গানের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে বাঙালির চিন্তনের মূল সুর। মা মেনকা কাঁদছেন কন্যা গৌরীর জন্য। নিজের ঘরের মেয়ের জন্যই এ আবেদন দেবীর উপর আরোপ করেছি আমরা। আবার দেশভাগের পর কত পরিবার সেই চণ্ডীমণ্ডপ, ঠাকুরদালান, বড়বাড়ি, ছোটবাড়ির অন্দরমহল ছেড়ে দেশত্যাগ করেছেন। বাংলার প্রথম পূজা রাজা কংসনারায়ণের মেহেরপুরও এখন বাংলাদেশে। কিছু কিছু পরিবার এখনও দুর্গাপূজার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। কারও বাড়ির দুর্গামণ্ডপে এখন বারোয়ারি দুর্গাপূজার আয়োজন করেন স্থানীয় হিন্দুরা। আবার কোনও কোনও বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বাদুড় আর ঘুঘুর বাসা। ছাদ খসে পড়েছে। তবু অস্তিত্ব অতীতের স্মৃতিকে জাগিয়ে রেখেছে, এখানে একদিন ঢাকে কাঠি পড়ত। দেবীর আগমন হতো শরৎকালে। আমরা বাংলাদেশকে দিয়েই আলোচনা শুরু করব।
বড়বাকুণ্ডের গাথা
দুর্গাপূজার প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের মেধস ঋষির আশ্রমের কথা বলতেই হবে। বাংলার শক্তিসাধনার তান্ত্রিক ধারা আর বৌদ্ধ তন্ত্র যে স্থানে মিশ্রিত হয়েছে এবং বিশেষভাবে শক্তিসাধনা যেখানে পরিস্ফুট হয়েছে সেই স্থান হল চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে ‘মগ’ নামে এক তান্ত্রিকের দেখা পাওয়া যেত। যাঁরা নানাবিধ অলৌকিক ক্রিয়াকলাপে পটু ছিলেন। কোনও এক কাকভোরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে উপস্থিত হয়েছিলাম। দেখেছিলাম বাসের সহযাত্রীদের মধ্যে বার্মিজ রয়েছেন বেশ কয়েকজন। সীতাকুণ্ড আসতেই তাঁরা দ্রুত নেমে গেলেন। এই ক্ষেত্র হল তাঁদের কাছে পিতৃপুরুষের পিণ্ডদানের জন্য প্রকৃষ্ট স্থান। এঁরা কিন্তু বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। কেন এই স্থান তাঁদের কাছে পবিত্র হল, তা জিজ্ঞেস করা হয়নি। সীতাকুণ্ড একান্নটি শক্তিপীঠেরও একটি পীঠ। পাহাড়ের কোলে দেবী অধিষ্ঠিতা। সমস্ত জায়গাটিতে মাটি থেকে গ্যাসীয় পদার্থ নির্গত হয়। তা শুকনো পাতায় লেগে ধিকিধিকি জ্বলা আগুনের সৃষ্টি করে। পীঠস্থানে মা কালীর বিগ্রহ। মন্দিরের পুরোহিত জানিয়েছিলেন তিনি যখন এই মন্দিরে পুজো করতে শুরু করলেন তখন সেই অঞ্চল আরও গহীন আর নির্জন ছিল। পাহাড়ের ঢালে বেশ কিছু সিঁড়ি অতিক্রম করে একটু সমতল জায়গা, সেখানেই দেবীর মন্দির, তারপর আরও কিছু সিঁড়ি অতিক্রম করে স্বয়ম্ভু শিবের অধিষ্ঠান। এমন শিবলিঙ্গ কখনও দেখিনি। একেবারে ডমরুর আকৃতি। বেশ বড়, কিন্তু খুব প্রাচীন। তাই শিবলিঙ্গে ফাটল ধরেছে। দেবীর পুরোহিত জানালেন দিনের আলো একটু কমলেই দেবীর আরতি ও শয়ন শেষ করে তাঁরা নীচে নেমে যান। কারণ তখন অনেক সাপ কোথা থেকে এসে জড়ো হতে থাকে একে একে। তখন নীচে নেমে উপরে তাকালে মন্দিরের বারান্দায় আর তার চারপাশে পাহাড়ের গায়ে জড়ানো বাঁশের ঝোপ থেকে জ্বলে ওঠা আগুন দেখা যায়। কে জ্বালাল? এই বড়বানলের জন্য গড়ে উঠেছে বড়বা কুণ্ড। ট্রেনে ফেরার সময় দেখলাম স্টেশনের নামও বড়বাকুণ্ড। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর মা-ও আত্মীয়াদের নিয়ে গিয়েছিলেন এই তীর্থ পরিদর্শন করতে। তখন আরও কত দুর্গম ছিল এই স্থান সেটাই ভাবছিলাম। কিন্তু সীতাকুণ্ড নয়, দেবী দুর্গার প্রকটিত হওয়ার স্থলটিও এই অঞ্চলে। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে উল্লিখিত মেধস ঋষির আশ্রম পাহাড়ের উপরে। কিন্তু এই দুই তীর্থের মধ্যে কোথায় যেন সংযোগ পাওয়া যায়। বঙ্গভূমির এ পার ও সেই পারের বাংলায় আমাদের দেবীপূজায় অবশ্য পাঠ্য শ্রীশ্রীচণ্ডীর মধ্যে দেবীর কত রূপের দেখা পাওয়া যায়। হয়তো সেই রূপগুলি খুব প্রচলিত নয়। সাধারণ মানুষ সেই রূপের কথা জানে না। কিন্তু সেই বিচিত্ররূপে তিনি কোথাও না কোথাও পূজিতা। আমরা প্রতিটি পূজাতেই দেবীর উদ্দেশে পূজা নিবেদন করি এবং দেবী মাহাত্ম্য স্মরণ করি। তার সঙ্গে চলে মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ। 
আজ আমরা দু’টি স্থানের কথা আলোচনা করব যে দুই স্থান ভৌগোলিক দিক দিয়ে পরস্পরের বহু দূরে অবস্থিত হলেও একই কাহিনি ও মাহাত্ম্য বুকে নিয়ে বেঁচে আছে। এর প্রথমটি হল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম। আমরা প্রথমে সেই স্থানের কথাই আলোচনা করব।
দুর্গা আরাধনা ক্ষেত্র
রাজশাহী জেলার তাহেরপুরে ১৪৮০ সালে, প্রথম কলির অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় মহারাজা কংসনারায়ণের মাধ্যমে। কিন্তু শ্রীশ্রীচণ্ডী বর্ণিত যে কাহিনি, তাতে মহারাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বিষাদগ্রস্ত হয়ে উপস্থিত হয়েছেন মেধস মুনির আশ্রমে। নিজেদের অকল্পনীয় দুঃখ, যাঁরা তাঁদের কষ্ট দিচ্ছে তাঁদের জন্য মনের মধ্যে বিচিত্র মায়ার কারণ তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারছেন না। নিজের মধ্যে এক অচেনা আমিকে দেখে রাজা ও বৈশ্য দু’জনেই স্তম্ভিত। তাই জিজ্ঞাসু দুই সত্তাকে জগতের মায়াজালের ওপারে যে মায়াময়ী রয়েছেন, যিনি আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন— তাঁর কথা শোনাচ্ছেন মেধস মুনি। এই প্রসঙ্গে তিনটি কাহিনি বর্ণনা করছেন ঋষি— প্রথম মধু-কৈটভ বধ, দ্বিতীয় দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী ও তৃতীয় শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের প্রসঙ্গ এসেছে। এই তিন ঘটনা ও রূপ নিয়েই শ্রীশ্রীচণ্ডী। মেধস ঋষি যখন দেবীর কথা বর্ণনা করলেন তখন রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বেতস নদীর ধারে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গঠন করে তাঁর পূজা করেন এবং দেবীকে তুষ্ট করে দু’জনে দুই ধরনের বরলাভ করেন। পরাজিত রাজা রাজ্য ফিরে পান আর স্বজনত্যাগী সমাধি স্বজনের সঙ্গে এই জগতের ভোগসুখ ত্যাগ করে সিদ্ধিলাভের বর চান এবং তা তিনি লাভ করেন। প্রশ্ন হল, এই মেধস ঋষির আশ্রম কোথায়, যেখানে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য সর্বপ্রথম দেবী আরাধনায় মগ্ন হন? এ নিয়ে বাংলায় দু’টি স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রথমটি হল বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। আমরা আগেই বলেছি, এই অঞ্চল তন্ত্রপ্রধান। উপরন্তু চট্টগ্রাম এমন একটি স্থান যেখানে সমুদ্র ও পাহাড় একসঙ্গে শোভা বিস্তার করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ প্রভাবিত। চট্টগ্রাম থেকে অল্প কিছু দূরে কর্ণফুলি নদীর তীরবর্তী অঞ্চলেই ছিল প্রসিদ্ধ দেয়াং মনাস্ট্রি। আমরা দেখি চট্টগ্রাম পাহাড়ের বোয়ালখালি সদর উপজেলার করলডাঙা নামে পাহাড়ের উপর অবস্থিত মেধস মুনির আশ্রমকেই প্রথম দুর্গাপূজার স্থান রূপে চিহ্নিত করা হয়। এই তীর্থের নাম ‘শ্রীশ্রীচণ্ডীতীর্থ’।
চট্টগ্রাম শহরের কানুনগো পাড়া থেকে আট কিলোমিটার দূরে পার্বত্য অঞ্চলে মেধস মুনির আশ্রম। সেখানে যেতে গেলে পেরতে হবে কালুরঘাট ব্রিজ। যাঁরা হিমালয় দেখেছেন তাঁদের কাছে এই পাহাড়টিকে বড়সড় টিলা বলেই মনে হবে। চড়াইয়ের শুরু থেকেই সিঁড়ি শুরু হয়েছে। সেই সিঁড়ি ধরে বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করতে হবে। তবেই মিলবে মন্দিরের বিরাট গেট। তার মধ্যে লেখা, ‘শ্রীশ্রীচণ্ডীতীর্থ, মেধস আশ্রম’। এখানেই ঋষি মেধস চণ্ডী বর্ণনা করেছিলেন। চারদিকে ছোট ছোট অনেক টিলা পাশাপাশি। প্রতিটির চূড়ায় একটি করে মন্দির। সবথেকে বড় টিলার একেবারে মাথায় মেধস মুনির আশ্রম। আশ্রমের শুরুতেই মেধস ঋষি ও বিষাদগ্রস্ত রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের মূর্তি! যাঁদের প্রণাম করেই মূল মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মূল মন্দিরের অন্তর্ভুক্ত নাটমন্দিরের মাথায় দেবী দুর্গার বিরাট মুখাবয়ব খোদিত। দুইদিকে দুটি শঙ্খ। ভিতরে দেবী দুর্গার মূর্তি। এই মূর্তি দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায়, মূর্তিটি একেবারেই আধুনিক। দশভুজা দেবী পরিবার সমন্বিতা। তাঁর মাথার উপর শিবের বিরাট মুখাবয়ব। এই মন্দিরে পূজা দিতে আসেন অসংখ্য পুণ্যার্থী। দুর্গাপূজার সময়, বিশেষ করে মহালয়ার দিন এই মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। কালিকাপুরাণে যে কোলা বিধ্বংসী রাজা সুরথের কথা বলা হয়েছে, সেই কোলা জাতি নাকি এসেছিল বর্তমানের মায়ানমার অঞ্চল থেকে। কারও মতে অসম থেকে এই কোলা উপজাতি যুদ্ধ করেছিল রাজা সুরথের সঙ্গে। কেবল এই একটি তথ্য নয়, চারদিকে ভয়ঙ্কর জঙ্গলে আচ্ছাদিত পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলছে বেতস নদী, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় বেতসা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবন থেকে সৃষ্টি হয়ে এই নদী প্রথমে শঙ্খ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, তারপর কর্ণফুলি নদীতে মিশে গিয়েছে। পুরাণে উল্লিখিত আছে, মেধস মুনির আশ্রমের পাশ দিয়েই বেতস নদী প্রবাহিত। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য সেই নদী থেকে নরম মাটি তুলে এনে তৈরি করেছিলেন দেবী প্রতিমা এবং তাকে মেধস মুনির আশ্রমেরই একপাশে পূজা করেছিলেন। এই পার্বত্য টিলায় বেতস নদীর উপস্থিতি কিন্তু এই স্থানটিকে মেধস মুনির স্থানরূপে চিহ্নিত করার পক্ষে একটি যুক্তি রূপে কাজ করেছে। হরিণ, ময়ূর, হাতির সঙ্গে যে জঙ্গলে বড় বাঘ থেকে কেঁদোর বাঘের এখনও উপস্থিতি রয়েছে। সেই পার্বত্য অঞ্চলটি কিন্তু প্রথম থেকে মেধস মুনির আশ্রম রূপে চিহ্নিত ছিল না। মাত্র ১৩০ বছর আগে স্বামী বেদানন্দ নামে এক সন্ন্যাসীকে স্বয়ং শিব নাকি স্বপ্ন দান করে বলেছিলেন, ‘এই স্থানটি প্রথম দেবী আরাধনার স্থান, এটিকে চিহ্নিত করে মন্দির প্রতিষ্ঠা কর’। সেই স্বামী বেদানন্দজি তখন এই স্থানে এসে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে নাকি দেবী মাহাত্ম্যের অস্তিত্ব বিষয়ে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছিলেন তিনি। তিনি দেখেছিলেন, এই অঞ্চলে বারো মাস দেবী দুর্গার প্রিয় শিউলি ফুল ফোটে। এছাড়া, প্রচুর গুলঞ্চ ফুল ও বেলপাতা পাওয়া যায়। এছাড়া মা সীতার পদচিহ্নও নাকি এখানে আছে, এখানেও দেখা যায় সীতাকুণ্ড নামে ছোট্ট একটি কুণ্ড। এছাড়া, চারপাশের টিলাগুলির চূড়ায় রয়েছে, শিব, কামাখ্যা, তারা দেবী, রাম-সীতা ইত্যাদির মন্দির। তবে এগুলির কাঠামোও অত্যন্ত আধুনিক। সানমাইকার দেওয়াল সেই গভীর জঙ্গলের মধ্যে খুবই বেমানান। এটি প্রথম দেবী দুর্গা পূজার স্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মিলিত হওয়ার স্থানও বটে। ১৯৭১ সালেও এই স্থানের মন্দিরাদি পাকিস্তানের সেনারা নষ্ট করে ফেলেছিল। পরে তা আবার নির্মাণ করা হয়। তবে এর পরবর্তীকালে এই মেধস মুনির আশ্রম এমন এক স্থান ছিল যেখানে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ এসে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যেতে পারতেন। এখন অবস্থার পরিবর্তন কী হবে বলা যায় না। এই মন্দিরগাত্রে দু’টি বিষয় উল্লেখ করার সেটি হল, দেবীর সম্মুখেই বিরাট যজ্ঞক্ষেত্র রয়েছে। যা প্রাচীন বলে বোধ হয়। আর সেই চত্বরেই একটি গাছ যাকে মনস্কামনা বৃক্ষ বলা হয়, তার তলায় চারদিক বাঁধানো স্থানে রয়েছে বেশ কিছু বিরল প্রজাতির কচ্ছপ। তাদের পিঠগুলি সিঁদুরমণ্ডিত। এই কচ্ছপগুলি কোন কাজে লাগে তা সঠিক জানা যায় না। তবে বলা হয়, এইস্থানে এই কচ্ছপগুলি অনেক আগে থেকেই ছিল। কারণ, স্বামী বেদানন্দের এই স্থানটি চিহ্নিত করার আগে থেকেই স্বয়ং মেধস মুনিই এখানে মন্দির তৈরি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সেই সূত্রে একটি ধাতু নির্মিত কালীমূর্তির দেখা যায়, যে দেবীমূর্তিকে মেধশ্বরী নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই তীর্থ গড়ে উঠতে একজন সন্ন্যাসীর ভূমিকা ছিল, এখনও সেই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা মন্দিরের পাশে আশ্রমে বাস করেন। তৃতীয়ত, আমরা প্রথমে সীতাকুণ্ডের কথা উল্লেখ করেছি, এই মেধস মুনির আশ্রমেও রাম-সীতার পদধূলি পড়েছিল বলে মনে করা হয়। চোদ্দো বছর বনবাসের সময় নাকি রাম-লক্ষ্মণ সীতাকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন। সীতা যেখানে স্নান করতেন সেই কুণ্ডটাকেই সীতাকুণ্ড বলে চিহ্নিত করা হয়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গায়ে সীতাকুণ্ডের মূল শিব হলেন চন্দ্রনাথ। পাহাড়ের উপর অনেক পথ অতিক্রম করে সেখানে যেতে হয়। শোনা যায় স্বামী বেদানন্দের আসল নাম ছিল চন্দ্রনাথ। কারণ তাঁর জন্ম হয়েছিল মহাদেব চন্দ্রনাথের কৃপায়। তাই এই মেধস মুনির আশ্রমে সীতাকুণ্ড আর চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সীতাকুণ্ডের মধ্যে একটা সংযোগসূত্র পাওয়া যায়। বলা হয় সত্য যুগে এখানে রাজা সুরথ দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। আর ত্রেতা যুগে রাম সমুদ্রের তীরে রাবণ বধের জন্য অকালবোধন করেছিলেন। সত্যযুগ আর আর ত্রেতা যুগকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে মেধস ঋষির আশ্রম। আর কলিযুগের দুর্গাপূজা করেছিলেন রাজা কংসনারায়ণ। সেটি হল রাজশাহীতে।
সব নিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার মেধস মুনির আশ্রম দুর্গা পূজার ক্ষেত্রে খুবই তাত্‌পর্যপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য আশ্রম। ঘন জঙ্গলের ধারে, নির্জন পাহাড়ের এক চূড়া থেকে আর এক চূড়ায় মন্দিরগুলি দেখতে যেতে বেশ অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হয়। রাতে যেখানে চলাচল ভীতিপ্রদ। যদিও রাত্রিবাসের জন্য মন্দির কমিটি অতিথি নিবাসের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। প্রায় ৬৮ একর জমিতে গড়ে উঠেছে মেধস মুনির আশ্রম। চট্টগ্রামবাসীদের কাছে যা উল্লেখযোগ্য একটি তীর্থ।
বাংলার সাধনভূমি
আমরা চণ্ডীবর্ণিত ঋষি মেধসের আশ্রম ও রাজা সুরথের প্রথম দুর্গাপূজার স্থান সম্পর্কে চট্টগ্রামের মেধস ঋষির আশ্রমের কথা জানলাম। কিন্তু চট্টগ্রামবাসীদের এই দাবির আরও একটি দাবিদার রয়েছে আমাদের ঘরের কাছেই। বলতে পারা যায় আমাদের উঠোনেই। বর্ধমান জেলার অজয় নদের তীরে গড়জঙ্গলে মেধস মুনির আশ্রম দাবি করে, এই হল আসল স্থান— যেখানে গড়ে উঠেছে মেধস মুনির মুখে চণ্ডীকথা। দেবী দুর্গার প্রথম আরাধনার স্থান এখানেই। কাছেই ইস্পাত নগরী দুর্গাপুর! শহরের নামটি কি দেবী দুর্গার খুব কাছাকাছি নয়! এই মতে বোলপুরের কাছেই সুপুরে ছিল রাজা সুরথের রাজত্ব। তিনি পরাজিত হয়ে এই গড়জঙ্গলে পালিয়ে এসেছিলেন। দেখা হয়েছিল সমাধি বৈশ্যের সঙ্গে। তারপর দু’জনে উপস্থিত হয়েছিলেন মেধস মুনির আশ্রমে। অজয় নদের তীরে তিনি প্রথম দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তির পূজা করেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন সমাধি বৈশ্য।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মেধস মুনির আশ্রম ১৩০ বছর আগে প্রকাশিত হলেও, অজয় নদের তীরে গড়জঙ্গলের এই মেধস মুনির আশ্রম কিন্তু খুব বেশিদিন হল আবিষ্কৃত হয়নি। ১৯৯২ সালে এক নাগা সন্ন্যাসী এই ক্ষেত্রে সাধনা করতে আসেন। জায়গাটি প্রত্নতাত্ত্বিক দিক দিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের চিহ্নিত স্থান। মন্দিরের সম্মুখের অংশে একটি আশ্চর্য রকম বিরাট ও প্রাচীন তেঁতুল গাছের অস্ত্বিত্ব লক্ষ করা যায়। যে তেঁতুল গাছের গুঁড়ির দিকে ফোকর দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় গাছের পেটের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে বিরাট এক গুহা। যেখানে একসঙ্গে চারজন লোক হাত-পা ছড়িয়ে একসঙ্গে বসতে পারবে। এই গাছের গুহার মধ্যেই নাগা সাধু তাঁর তপস্যার আসন পেতেছিলেন। তিনিই এই স্থানটিকে মেধস মুনির আশ্রম বলে চিহ্নিত করেন। স্থানটিতে প্রাচীন যুগ যেন ওত পেতে রয়েছে। তার সঙ্গে মিশেছে এক অপা র্থিব কিছু কাহিনির সম্ভার। আমরা আগেই বলেছি, মূল তিনটি কাহিনি শ্রীশ্রীচণ্ডীতে উল্লিখিত হয়েছে। এই তিন কাহিনির মধ্য দিয়ে দেবীর তিনটি রূপ প্রকাশিত হয়েছে। মহাসরস্বতী, মহাকালী আর মহালক্ষ্মী। ঘন জঙ্গলের মধ্যে, মোরাম বিছানো রাস্তার ধারে, গা ছমছমে পরিবেশে গড় চণ্ডিকাধাম। প্রবেশপথেই দেবী প্রণাম, ‘ওঁ নমশ্চণ্ডিকায়’। চণ্ডিকা দেবীকে নমস্কার। প্রণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। মূল দুর্গামণ্ডপে বছরে দু’বার দুর্গাপূজা হয়। একবার বাসন্তী পূজা। রাজা সুরথ দেবী পূজা করেছিলেন বসন্তকালে। সেই পূজা এখন বাসন্তী পূজা। গড়জঙ্গলে বাসন্তী পূজার সঙ্গে শারদীয়া অকালবোধনও সমারোহের সঙ্গে পালিত হয়। পুজোর কয়েকটি দিন নীরব জঙ্গল জনসমাগমে মুখর হয়ে ওঠে। তিলধারণের জায়গা থাকে না। নানা অপার্থিব ঘটনা নাকি তখন ঘটে। তখন দেবী জাগ্রতা হন। দেবীমণ্ডপের সামনে বিরাট অখণ্ড যজ্ঞকুণ্ড। সেখানে বেশ কয়েকটি মোটা কাঠ ফেলা রয়েছে। সর্বক্ষণ সেই যজ্ঞস্থল থেকে ধোঁয়া উঠছে। মূল মণ্ডপ ছাড়া তিন দিকে তিন দেবীর মন্দির। মহাকালী দশভুজ ও দশমুণ্ডধারী। নিকষ কালো রূপ। একদম পৃথক একটি মূর্তি। এরই সঙ্গে মহাসরস্বতী ও মহালক্ষ্মী দেবীর পৃথক মন্দিরও সাধকদের আকৃষ্ট করে। শ্রীশ্রীচণ্ডী বর্ণিত দেবীর এই তিন রূপ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা খুব কম। আমরা জানি তিনি মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। তিনি দুর্গা। এতটুকুই, কিন্তু প্রতিটি রূপ যে পৃথক সে সম্বন্ধে আমাদের ধারণা থাকলে আমরা আরও ভালো করে দুর্গা পূজাকে উপভোগ করতে পারি। চট্টগ্রাম মেধস মুনির আশ্রমের মতো, পশ্চিমবঙ্গের মেধস মুনির আশ্রমও প্রকাশিত হয়েছিল এক সন্ন্যাসীর মাধ্যমে। দু’জনেই যোগবলে এই স্থানটিকে চিহ্নিত করেছেন। দুই জায়গাই বিশেষ লক্ষণযুক্ত এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে পরিপূর্ণ। একটি বেতস নদীর তীরে। অন্যটি অজয় নদীর ধারে।
গড়জঙ্গলের গড়চণ্ডীধামের মন্দির সংলগ্ন চারপাশ কিন্তু খুব প্রাচীন ঐতিহাসিক কাহিনি ও ঐতিহ্যের অধিকারী। এই তীর্থ বলতে গেলে আমাদের বেশ কয়েকটি মন্দিরের কথা উল্লেখ করতে হবে। সেখানে রয়েছে রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির, শ্যামারূপা কালী, গড়চণ্ডীধাম, ইছাই ঘোষের দেউল। এই মন্দিরগুলির মধ্যে গড়চণ্ডীধামই হল সর্বাধিক নবীন। ঢ়ারেশ্বর শিব মন্দির দ্বাদশ শতাব্দীর তৈরি বলে মনে করা হয়। বেলে পাথর আর মাকড়া পাথরের তৈরি মন্দিরে শিবলিঙ্গে দেবতা বিরাজ করছেন। বাংলার আটচালা ধরনের নয় একেবারেই। মন্দিরের গর্ভগৃহ ধাপে ধাপে ছুঁচালো হয়ে গিয়েছে। মন্দিরের চূড়াও তীক্ষ্ম। এরপর মোরামের রাস্তা ধরে চারপাশের ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পৌঁছতে হবে শ্যামারূপা কালী মায়ের মন্দিরে। এখান থেকেই পুরাণ, ইতিহাস আর কিংবদন্তি মিলেমিশে এক বিচিত্র কাহিনি তৈরি করেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল এই দেবী কালী নামে চিহ্নিত হলেও তাঁর মূর্তি কিন্তু দেবী দুর্গার। যেমন বাংলাদেশের ঢাকা শহরে প্রসিদ্ধ ‘ঢাকা কালীবাড়ি’তে আরাধ্য দেবী কিন্তু দুর্গা, তাঁকে কেন কালীবাড়ি বলা হয় তা জানি না। তবে আশ্চর্য হয়েছি ঢাকা কালীবাড়ির দেবী দুর্গার মূর্তির সঙ্গে গড়জঙ্গলের শ্যামারূপা কালী মন্দিরস্থ দেবীমূর্তির আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখে। এই মন্দিরেও দুর্গাপূজা হয় এবং অষ্টমীর দিন নাকি দেবীর ধ্যানমূর্তি উচ্চারণের সময় মেঘের গর্জন শুনতে পাওয়া যায়। এই রকম বেশ কিছু অলৌকিক কাহিনি এই মন্দিরকে নিয়ে প্রচলিত আছে। কিন্তু আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে দেবীকে শ্যামারূপা বলা হয় কেন? এর পিছনে একটি ঐতিহাসিক কাহিনির উল্লেখ 
করা হয়।
বাংলায় তখন সেন বংশের রাজত্ব। রাজা লক্ষ্মণ সেন কোনও যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসে গড়জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েন। এই অঞ্চল তখন তাঁরই শাসিত অঞ্চল ছিল। ঘন জঙ্গলের মধ্যে সেই সময় এক কাপালিক তাঁর সাধনা করতেন গুপ্তভাবে। এই তান্ত্রিক সাধক সিদ্ধিলাভের জন্য দেবীর সম্মুখে নরবলি দিতেন। সেই জঙ্গলের রাস্তায় কোনও পথিক যদি পথ ভুলে ঢুকে পড়তেন, তবে তাঁর আর বেঁচে ফেরার উপায় ছিল না। কাপালিক তাদের ধরে দেবীর কাছে বলি দিতে ভুল করতেন না। লক্ষ্মণ সেন ব্যাপারটি জানতে পেরে কাপালিককে এই নরবলি বন্ধ করতে বলেন। ধূর্ত কাপালিক জানান, দেবী তাঁকে বলেছেন রাজা যদি একবার নরবলি দিয়ে তাঁর পূজা করেন তবে তিনি তুষ্ট হবেন। এই কথা শুনে পূজার আয়োজন চলতে থাকে। এই সময় গীতগোবিন্দের রচয়িতা জয়দেব রাজার সঙ্গে দেখা করতে এলেন এবং সব কথা শুনে তিনিও নরবলির বিরুদ্ধে কাপালিককে নানা কথা বলতে শুরু করলেন। নিষ্ঠুর কাপালিক জয়দেবকে জানালেন, যদি দেবীর গাত্রবর্ণ শুক্ল থেকে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে তবে বুঝব দেবীও নরবলি বন্ধ করতে আদেশ দিচ্ছেন। জয়দেব তখন দেবীর কাছে আকুল হয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। তাঁর প্রার্থনায় দেবীর গাত্রবর্ণ সত্যই কৃষ্ণরূপ ধারণ করেছিল। সেই থেকে তিনি কৃষ্ণরূপা কালী নামে চিহ্নিত হলেন। 
এখানে উল্লেখ্য যে গীতগোবিন্দ রচয়িতা জয়দেবের বাড়ি এই গড়জঙ্গলের কাছেই কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে। এই তথ্য বেশ আশ্চর্যজনক।
এরপরে এই অঞ্চলে ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষের দেউল এই অঞ্চলের শোভা বৃদ্ধি করেছে। ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষ ঐতিহাসিক চরিত্র। ১৮৩৩ সালে একটি তাম্রপত্র পাওয়া যায়। এই তাম্রপত্র অনুযায়ী একাদশ দশকে পাল বংশীয়দের মধ্যে বাংলা শাসন করছিলেন মহীপাল, ১১০০ শতকের মধ্যভাগ। যে সময় রচিত হয়েছে ধর্মমঙ্গল কাব্য। সেখানে বলা হয়েছে, তখন গড়জঙ্গল ছিল ইছাই ঘোষের অধীন। গৌড়বঙ্গের রাজা ইছাই ঘোষকে পরাজিত করার জন্য সেনাপতি কর্ণসেনকে পাঠালেন। কিন্তু কর্ণসেন ইছাই ঘোষের কাছে পরাজিত হলে কর্ণসেনের পুত্র লাউসেনকে রাজা যুদ্ধ করতে পাঠালেন। ইছাই ঘোষের মতো লাউসেনও ছিলেন দেবী ভক্ত ও দৈবী ক্ষমতার অধিকারী। শোনা যায় দীর্ঘদিন লাউসেন ও ইছাই ঘোষের যুদ্ধ হল কিন্তু কেউ কাউকে পরাজিত করতে পারলেন না। একদিন রাত্রে স্বয়ং মা চণ্ডী ইছাই ঘোষকে স্বপ্নদান করে লাউসেনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বারণ করলেন। কিন্তু ইছাই ঘোষ মায়ের আদেশ মান্য না করে যুদ্ধে গেলেন এবং পরাজিত হলেন। ইছাই ঘোষের দেউল মনে করা হয় এক বিজয় স্তম্ভ যা ইছাই ঘোষের পরবর্তীকালে তাঁরই কোনও বংশধর গঠন করেছিলেন। 
ধর্মমঙ্গলের কাহিনির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দেউল আমাদের জানায়, এই গড়জঙ্গল দেবী আরাধনার স্থান ছিল বহু আগে থেকেই, ১৯৯২ সালে সেই স্থানেই নাগা সন্ন্যাসী দেবীমাহাত্ম্যকে অনুভব করলেন এবং প্রতিষ্ঠা করলেন মেধস ঋষির আশ্রম। কেবল তাই নয়, মেধস ঋষির আচমনের স্থান, যে স্থানে অজয় নদ থেকে মাটি এনে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য দেবী দুর্গার মূর্তি তৈরি করেছিলেন এবং জগতে প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল। গড়জঙ্গলে তার সঙ্গে মিশেছে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির কাহিনি। এখানে একটি সুড়ঙ্গের দেখা পাওয়া যায়, যে সুড়ঙ্গকে দেবী চৌধুরানির ব্যবহৃত সুড়ঙ্গ বলে মনে করা হয়।
দেবীর প্রথম পূজা কোথায় প্রচলিত হয়েছিল তা নিয়ে আমরা দু’টি স্থানের কথা আলোচনা করলাম। যে দু’টি ক্ষেত্রে মধ্যে দু’টিই হল শক্তিসাধনার জন্য প্রকৃষ্ট বা বহুযুগ আগে থেকেই এই স্থানে দেবী আরাধনা হয়ে আসছে। দেবী পূজার মহাক্ষণে আমরা সেই দুই স্থানের মাহাত্ম্য তুলে ধরলাম।                  
                                 ছবি সংগৃহীত
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ