বিশাল ভারত পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনুসারে। সংবিধান কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির দায়িত্ব-কর্তব্য ভাগ ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠার জন্য রাজ্যগুলিতে কিছু বিধিবদ্ধ সংস্থা বা এজেন্সি আছে। তেমনি আছে জাতীয় ক্ষেত্রে বেশকিছু কেন্দ্রীয় এজেন্সি। জাতীয় নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চালু রয়েছে সিবিআই, আরএডব্লু (সংক্ষেপে ‘র’), এনআইএ, আইবি, এনসিবি, ইডি, একাধিক সেন্ট্রাল আর্মড পুলিস ফোর্স প্রভৃতি। এগুলির মধ্যে কে ছোটো বা কে বড়ো তা আলাদা করে বলা মুশকিল। সংস্থাগুলির প্রতিটির এক্তিয়ার সুনির্দিষ্ট এবং নিজ নিজ পরিধিতে তারা বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। যেমন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) ক্ষমতাধর, তেমনি বহির্ভারতে রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)। অন্যদিকে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অপরাধ এবং অন্যান্য মারাত্মক অপরাধ দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার নাম সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)। নারকোটিক ড্রাগের মোকাবিলা করে নারকোটিক কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)। কাউন্টার টেররিজম অপারেশন এবং ওই সংক্রান্ত তদন্তে নিযুক্ত রয়েছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। আর্থিক দুর্নীতি এবং মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এসব এজেন্সি পরিচালনায় রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি হল—‘ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স, মিনিমাম গভর্নমেন্ট’। ঘোষিত অবস্থান হল—স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, সুসমন্বয় এবং পাবলিক সার্ভিসে যথাসম্ভব কম হস্তক্ষেপ। মূল লক্ষ্য হল—আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশজুড়ে সংবিধাননির্দিষ্ট সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংহতির পরিবেশকে আরও উন্নত করা। মোদ্দা কথায়, ভারত রাষ্ট্রের সর্বত্র ‘সত্যের জয়কেই’ প্রতিষ্ঠা করা। বলা বাহুল্য, ক্ষমতাবান হলেও কোনও এজেন্সির কিন্তু হাতে মাথা কাটার এক্তিয়ার দেওয়া হয়নি। এগুলি দিনের শেষে আদালত এবং আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ।
কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি সম্পর্কে এতক্ষণ ধরে যে বর্ণনা পাওয়া গেল তা আদর্শ পরিস্থিতির। এজেন্সিগুলিকে বাস্তবে এমন ভূমিকায় কে কবে পেয়েছে, তা এক গবেষণার বিষয়। বরং এজেন্সিগুলির কার্যকলাপ নিয়ে বারবারই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিরূপ প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি উঠেছে সিবিআই, ইডি এবং এনআইএ’র বিরুদ্ধে। বিরোধীদের নিশানায় বারবার উঠে এসেছে আয়কর (আইটি) বিভাগও। বিরোধীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি কমবেশি ‘একচক্ষু’, অর্থাৎ শাসক পক্ষের দোষ ত্রুটি অপরাধ তাদের চোখে তেমন ধরা পড়ে না। বিরোধীদের দমনে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতিসক্রিয়তাই নজর কাড়ে। এজেন্সিগুলির সময়জ্ঞানও সন্দেহের উদ্রেক ঘটায় বইকি। কিছু পুরোনো মামলার তদন্তে দেখা যায়, সিবিআই, ইডি, এনআইএ প্রভৃতি সংস্থা কোনো কিনারা করতে না পেরে একসময় রীতিমতো ঘুমিয়েই পড়ে। দেখে মনে হয়, তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে কিংবা অব্যাহতিই নিয়েছে। কিন্তু লোকসভা, বিধানসভার মতো নির্বাচন এলেই তাদের আকস্মিক অতিসক্রিয়তা প্রকট হয়। ফলে একজন শিশুরও বুঝতে বাকি থাকে না যে, কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি কতখানি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তদন্তকারী অফিসাররা আইনি বা সাংবিধানিক দায়িত্বকর্তব্য ভুলে রাজনৈতিক প্রভুর হুকুম তামিল করে চলেছেন।
এই অন্যায় কংগ্রেস আমলেও হয়েছে। সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে মোদি জমানা। এজেন্সির এই হতাশাজনক ভূমিকা আদালতেরও নজর এড়ায়নি। এজন্য হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার এজেন্সির ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশসহ কড়া মন্তব্য করেছে। ভরা কোর্টে বারবার ভর্ৎসিতও হয় তারা। তারপরেও এজেন্সিকে প্রত্যাশিত চেহারায় পাওয়া যায় না। মোদি জমানায় কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি প্রভৃতির ক্ষেত্রে। কোনও সন্দেহ নেই যে, বিরোধীদের কণ্ঠরোধের মস্ত হাতিয়ারের নাম আজ কেন্দ্রীয় এজেন্সি। প্রতিকার চেয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবচেয়ে বেশি সরব। বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক পরিসরে, কখনো সমাজমাধ্যমে, আবার কখনো জনতার দরবারে। এই ইস্যুতে সংসদও উত্তাল হয়েছে একাধিকবার। শনিবার মমতা বিষয়টি উত্থাপন করেছেন স্বয়ং দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের সামনে। কলকাতা হাইকোর্টের উত্তরবঙ্গ সার্কিট বেঞ্চ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল। জলপাইগুড়িতে ওই অনুষ্ঠান ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বঙ্গসফর চলাকালেই। অনুষ্ঠানে মঞ্চে তখন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়াল এবং একঝাঁক ন্যায়াধীশ। তাঁদের সামনেই প্রধান বিচারপতির কাছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আরজি, ‘সংবিধানকে বাঁচান; গণতন্ত্রকে রক্ষা করুন; জনগণকে রক্ষা করুন; দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচান।’ ন্যায়াধীশদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘বিপর্যয়ের হাত থেকে সংবিধানকে রক্ষা করতে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের। দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধান বিপন্ন। সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার উপর ভরসা রাখে। বিচারব্যবস্থা আমাদের সংবিধানের রক্ষাকর্তা। দেশের মানুষকে রক্ষা করাও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই আরজি সময়োচিত এবং প্রশংসনীয়। কারণ কেন্দ্রীয় এজেন্সির অপব্যবহারের মূল্য চোকাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ। এই অন্যায় অবিলম্বে বন্ধ না-হলে গণতন্ত্রের সঙ্গে দেশটাই রসাতলে যাবে। এই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।