রামপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়: শাস্ত্রে আছে ‘রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।’ অর্থাৎ রথে অবস্থিত বামন জগন্নাথকে একবার দর্শন করলে মানুষের আর পুনর্জন্ম হয় না। ভবিষ্যপুরাণে আছে সূর্যদেবের রথযাত্রার কথা, দেবীপুরাণে মহাদেবীর আর পদ্মপুরাণ বা স্কন্দপুরাণে আছে বিষ্ণুর রথযাত্রার কথা। হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পার্বণ, তার মধ্যে রথযাত্রা এক বিরাট উৎসব। পুরীর জগন্নাথ, পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল, বড়িশার সুবর্ণ রায়চৌধুরীদের রথ, শ্রীরামপুরের মাহেশ, গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠ, কলকাতা ও বাংলাদেশের ইসকন সবাই একসঙ্গে রথযাত্রায় মেতে ওঠে।
১৭১৯ সালে বড়িশা গ্রামে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের রথযাত্রা শুরু করেছিলেন রায় কৃষ্ণদেব মজুমদার চৌধুরী। ১৭৫৫ সালে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক মাহেশে জগন্নাথদেবের মন্দির স্থাপন করেন। ১৭৮৪ সালে স্বামী মধুসূদানন্দ হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় জগন্নাথদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই রয়েছে বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির। গুপ্তিপাড়াকে অনেকেই গুপ্তবৃন্দাবন মনে করেন।
কোথাও রথযাত্রার তিথিতে কোথাও বা উল্টো রথযাত্রার দিনে দুর্গোৎসবের কাঠামো পুজো হয়। কুমারটুলিতেও প্রতিমার কাঠামো পুজো হয়। কাঠামো পূজিত হয় ফুল মালা দিয়ে। প্রথমে বিশ্বকর্মার পুজো করা হয়, পরে গঙ্গা নিমন্ত্রণ। এদিন জগন্নাথদেবকে ৫৬ ভোগের অন্যতম ‘কণিকা-ভোগ’ বা মিষ্টি পোলাও উৎসর্গ করা হয়।
জগন্নাথদেবের উপাসনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা পৌরাণিক কাহিনি। উপজাতি রাজা বিশ্ববসু একটি পাথর খুঁজে পান যার মধ্যে তিনি ঐশ্বরিক শক্তি লক্ষ করেন। তিনি তার নাম দেন নীলমাধব এবং তার উপাসনা শুরু করেন। এই সময় ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন চন্দ্র বংশের রাজা। এক ভ্রমণকারী তীর্থযাত্রী এসে তাকে বললেন ওড্র অর্থাৎ ওড়িশার নীলাচলে নীলমাধবের পুজো করা হচ্ছে। তার পর তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। রাজা তখন পুরোহিত বিদ্যাপতিকে সেখানে পাঠান। তিনি মহানদী পেরিয়ে সাগর পাড়ে জঙ্গলে পৌঁছন। সেখানে রাজা বিশ্ববসুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। বিদ্যাপতি সেখানে রোহিণী-কুণ্ডে স্নান করে গিয়ে দেখেন নীলমাধবকে শবররাজ পুজো করছেন। তারপর বিদ্যাপতি রাজধানী অবন্তীতে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে ফিরে যান। সব শুনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরোহিত, বিদ্যাপতি আর অন্যান্য লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু গিয়ে দেখেন নীলমাধব অদৃশ্য। চারধারে দৈববাণী শোনা যায়— ‘এই ধরাধামে আমি নীলমাধব রূপে দর্শন দেব না, আমি চারটি রূপে প্রকাশিত হব— জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা আর সুদর্শন। চক্রতীর্থের কাছে একটা দারু অর্থাৎ কাঠ জলে ভেসে আসবে। সেই বড় সুগন্ধযুক্ত লালচে লগ বা কাঠের গুঁড়িতে তোমরা শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম চিহ্ন দেখতে পাবে। সেই গুঁড়ি থেকে তোমরা দেবতার মূর্তি তৈরি করে আমার উপাসনা করতে পারবে।’
রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন মন্দির স্থাপন করে যখন মূর্তি তৈরির জন্য কাষ্ঠশিল্পীর খোঁজ করছিলেন তখন এক ব্রাহ্মণ তার সামনে এসে উপস্থিত হন। আসলে তিনি ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। রাজা তাকে মূর্তিগুলি তৈরি করতে বলেন। সেই শিল্পী তখন রাজার কাছ থেকে মূর্তি তৈরির জন্য হাতে ক’টা দিন সময় চেয়ে নিয়ে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেন। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করছিলেন বিশ্বকর্মা। রাজা-রানি রোজই মন্দিরের দরজার বাইরে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। কৌতূহল ভিতরে কী হচ্ছে তা জানার। একদিন রানি জোর করে মন্দিরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়েন। বিশ্বকর্মা অসন্তুষ্ট হয়ে মূর্তিগুলো তৈরি অসম্পূর্ণ রেখে অদৃশ্য হয়ে যান। তখন থেকেই তাই আর মূর্তিগুলোর কোনও হাত, পা নেই।
মাদালা পাঞ্জি বা পঞ্জিকা যার ভাষা ওড়িয়া, এটি জগন্নাথদেবের পুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। পরে এটি ওড়িয়ার পাশাপাশি তেলুগু লিপিতে রেকর্ড করা হয়। এটি মাদ্রাজের পাণ্ডুলিপি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। রথযাত্রার ইতিহাসের অনেক কথাই এখান থেকে জানা যায়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনকে স্মরণ করেই এই রথযাত্রা। কথিত আছে, রথের রশি টানলে সর্ব মনোস্কামনা পূর্ণ হয়।
পুরীর অপর নাম শ্রীক্ষেত্র বা পুরুষোত্তম ক্ষেত্র। পুরীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাপ্রভু চৈতন্যের নাম। চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন বৈষ্ণব দর্শন ও ভক্তিবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা ও প্রচারক। একসময় তিনিও সাক্ষী থেকেছেন পুরীর এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার।
জগন্নাথের পুরীর মন্দির থেকে তার মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচা মন্দিরে যাওয়ার পথটাকে বলা হয় বড় দাণ্ডে। সেখানে একটা চওড়া নালা ছিল। নাম বলাগুণ্ডি নালা। আসলে এটা ছিল সারদা নদী। নদীর দক্ষিণ পাড়ে ছিল অর্ধাশনী আর উত্তর পাড়ে গুণ্ডিচা। তখন এই নদী পারাপারের জন্য কোনও সেতু ছিল না। ফলে তিনটি রথে জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রাকে নদীর দক্ষিণ পাড়ে নিয়ে আসা হতো। তারপর রথগুলি থেকে তাদের তিনজনকে কোলে করে বা নৌকা করে নামিয়ে নদী পেরিয়ে উত্তর পাড়ে রাখা অন্য তিনটি রথে চাপিয়ে মাসির বাড়ি গুণ্ডিচাতে নিয়ে যাওয়া হতো। বর্তমানে এই নদী শুকিয়ে গিয়েছে। তবে এর মোহনা দেখা যায়। নাম বঙ্কি মোহনা। এখানেই দর্শনীয় স্থান চক্রতীর্থ। আগে জগন্নাথের রথযাত্রার জন্য পুরীতে ছয়টি রথ ব্যবহার করা হতো। ১২৮২ সালে রাজা কেশরী নরসিংহ পুরীর ভারপ্রাপ্ত রাজা হন। তখন তিনি এই বলাগুণ্ডি নালা বুজিয়ে দেন। ফলে এপার ওপার যাওয়ার আর কোনও অসুবিধে থাকে না। তখন থেকে তিনটি রথই যথেষ্ট। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পুরীর রথযাত্রায় তাই তিনটি রথই বের হয়— নন্দীঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলন।
রথ তৈরির কাঠ আসে পুরীর নিকটবর্তী দাশপাল্লা ও রনোপুর জঙ্গল থেকে। রথ তৈরি শুরু হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে। রথযাত্রা পালিত হয় আষাঢ় মাসের শুক্লাপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে। এই দিন সুসজ্জিত তিনটি রথ বের হয়। দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে মাসির বাড়ি যান জগন্নাথ। গুণ্ডিচা মন্দির ওড়িশার পুরী শহরের উত্তর কোণে, জগন্নাথের মাসির বাড়ি। গুণ্ডিচা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী। রথযাত্রায় প্রথমেই যায় বলরামের রথ। এরপর যায় বোন সুভদ্রার রথ। তাঁর রথের নাম দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ। এরপর যায় জগন্নাথদেবের রথ। রথের নাম নন্দীঘোষ বা কপিধ্বজ বা গরুড়ধ্বজ। মাসির বাড়ি থেকে আবার সাত দিন পর উল্টোরথের দিন পুরীর মন্দিরে ফিরে আসেন জগন্নাথ।
শ্রীরামপুরের মাহেশে ১৮৮৫ সালে মার্কিন-বার্ন কোম্পানির সহায়তায় বারোটি লোহার চাকা বিশিষ্ট সম্পূর্ণ লোহার কাঠামোর পঞ্চাশ ফুট রথ তৈরি হয়। এটি ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ও বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রা। সাতদিন বাদে উল্টোরথের দিন রথটি মন্দিরে ফিরে আসে। মাহেশের রথের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারাণী’ উপন্যাসে ফুল বেচতে এসে রথের মেলায় রাধারানির হারিয়ে যাওয়ার অশ্রুবিধুর কাহিনি।
ভারতের বাইরে পালিত হওয়া প্রথম রথযাত্রা আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে। আমেরিকার ফ্লোরিডাতে আছে আমেরিকার প্রথম জগন্নাথের মন্দির। ইংল্যান্ডের লন্ডনে ট্রাফালগার স্কোয়ারে ধুমধাম করে উদ্যাপিত হয় রথযাত্রা উৎসব। রাশিয়ার মস্কোতে বহু মানুষ ভারতীয়দের মতো রথযাত্রা উৎসবে মেতে ওঠেন। চেক রিপাবলিকের প্রাগে চল্লিশ ফুট উঁচু রথ কার্নিভালে বের হয়। রথের সামনে গায়ক, বাদক, নর্তক-নর্তকীরা নানান অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে করতে এগিয়ে চলেন। রোমের ইতালিতে ১৯৮১ সাল থেকে রথযাত্রা চালু আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ১৯৮৮ সাল থেকে রথযাত্রা উৎসব চালু হয়। নেপালের ভক্তপুরে বিপুল উদ্দীপনার সঙ্গে পালিত হয় রথযাত্রা। বাংলাদেশের ধামরাইয়ের জগন্নাথ রথ খুব বিখ্যাত। এখানকার রথযাত্রা বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সর্বাধিক প্রাচীন ও বৃহত্তম রথযাত্রা। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে কার্নিভালের মতো ধুমধাম করে রথযাত্রা চলে আর তার সঙ্গে চলে সাংস্কৃতিক উৎসব। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে আছে ইসকনের মন্দির। এখানে ইসকনের পরিচালনায় ইসকনের সন্ন্যাসীরা সঙ্গীত ও নৃত্যে মাতিয়ে তোলেন রথযাত্রা উৎসব।
ইসকনের প্রধান কার্যালয় মায়াপুরেও পালিত হয়ে আসছে এই রথযাত্রা। এখানকার রাজাপুর গ্রাম থেকেই রথযাত্রার শুরু। এই রথযাত্রার আয়োজন করে থাকেন মায়াপুর ইসকন মন্দির কর্তৃপক্ষ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গ্রামের আপামর জনসাধারণ এই উৎসবে মেতে ওঠেন। জগন্নাথ জগতের নাথ, সকলের নাথ। ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। রাজাপুর জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে ৫ কিলোমিটার দূরে রথ গিয়ে পৌঁছয় অস্থায়ী মাসির বাড়ি চন্দ্রোদয় মন্দিরে। এই সময় ক’দিন ধরে চলে ৫৬ ভোগ, দীপদান, অষ্টকম পাঠ আর তার সঙ্গে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রসাদ বিতরণ।
রথের মেলা মানেই পাঁপড় ভাজা, জিলিপি, নাগরদোলা, সার্কাস, ম্যাজিক ইত্যাদির সমারোহ। ছোট বড় সবার মিলনক্ষেত্র এই রথের মেলা; হারিয়ে যাওয়ার মেলা। মানুষ এখানে নতুন করে খুঁজে পায় মহামিলনের মন্ত্র। তারই মাঝে কবিগুরুর দু’টি লাইন মনে পড়ে যায়— ‘পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব হাসে অন্তর্যামী’।