সাড়ে পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন জনপদ বরানগর। এর আনাচে কানাচে বছরভর নানা উৎসব-মেলা লেগেই থাকে। ঝুলন মেলা, রথের মেলা, শীতলা পুজোর মেলা, চৈত্র মেলা থেকে বইমেলা—তালিকা বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত প্রাচীন লোক উৎসব পালপাড়ার চড়ক মেলা। বরানগরের আঞ্চলিক ইতিহাসবিদদের মতে, এই মেলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাত্মবোধ ও মিলনের প্রতিফলন ঘটে।
প্রয়াত ইতিহাসবিদ অজিত সেনের আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থের নবম খন্ডে বরানগরের পালপাড়ার এই চড়কের মেলা নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনি। অপর এক আঞ্চলিক গবেষক সজল চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ‘চড়ক মেলা হল বরানগর অঞ্চলের অন্যতম লোক উৎসব। আনুমানিক ২০০ বছর আগে এই মেলার সূচনা। কলকাতার গা ঘেঁসে থাকা এই অঞ্চলে তখনও নগরায়নের ছোঁয়া লাগেনি। একেবারে গ্রামীণ পরিবেশে এই মেলা হতো। এখানকার জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বৃদ্ধ প্রপিতামহ এই মেলার প্রবর্তন করেন। চৈত্র সংক্রান্তির তারকেশ্বরের গাজন উৎসবের পরদিন চিড়িয়া মোড়ের কাছে পাইকপাড়া রাজাদের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে যে মেলা বসত। তা ‘বাসি চড়কের মেলা’ নামে পরিচিত ছিল। আর পালপাড়ার মেলাকে বলা হত ‘পচা চড়কের মেলা’। বর্ধিষ্ণু ভট্টাচার্য পরিবারের বাস ছিল বরানগর বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে। জমিদারের বাসস্থান এলাকাটির নাম ছিল বামুন পাড়া। এই এলাকায় ছিল তাঁদের জ্ঞাতিদের বসতি। এটি ছিল ভট্টাচার্যিদের চড়ক।’ ইতিহাসবিদ অজিত সেন তাঁর বরানগর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যেখানে চড়কের দন্ড পোঁতা থাকতো, সেখানে চড়ক ঘুরত। জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ির লাগোয়া উত্তর দিকের ফাঁকা জমিতে ছিল দোলমঞ্চ।’ বর্তমানে এই মেলা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহে বিটি রোডের পালপাড়ায় বসে এই মেলা। রাস্তার দু’ধারে হরেক সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে দোকানপাট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বরানগর পালপাড়ার এই প্রাচীন চড়ক মেলার জনপ্রিয়তা এই এলাকা ছাড়িয়ে ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। - প্রতীকী চিত্র